আমাদের সবচাইতে বড় ও সচল শিল্প হলো, ‘কথাবলা শিল্প’। এ শিল্প চলছ এবং চলবেই। মৃত্যুর আগপর্যন্ত মানুষ কথা বলে যাবেই। এজন্য বাড়তি কোনো জ্বালানির প্রয়োজন নেই। মানুষের আয়ুর জ্বালানিটা থাকলেই চলবে। এই যে আমরা এত কথা বলছি, এর কি কোনো হিসেব রাখতে নেই? কথারতো ভালো-মন্দ আছে, সত্য-মিথ্যা আছে, ন্যায়-অন্যায় আছে। অতএব কথার হিসেবও আছে। কিন্তু হিসেবের কথাটা আমাদের মাথায় থাকে কী? কথার হিসেব না থাকলে আমলের হিসেব থাকবে কেমন করে? এটা শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটা পরিবারের সমস্যা, সমাজের সমস্যা, রাষ্ট্রের সমস্যা, বিশ্বের সমস্যাও বটে। অথচ এমন বিশাল সমস্যা নিয়ে তেমন কথা হয় না, বিশ্লেষণও হয় না। ফলে ব্যক্তি, সমাজ এবং পৃথিবীর সনমস্যা বাড়ছে। ঈদের ছুটিতে এই বিষয়টা আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে।
কথার হিসেব নিয়ে কথা বলছিলাম। বলছিলাম ‘কথাবলা শিল্প’ চলছে এবং চলবেই। ঈদের ছুটিতেও বিষয়টা লক্ষ্য করলাম। কত কথা, কতজনের কথা, কত বিষয়ে কথা, ঈদ নিয়েও কথা কম হয়নি। এক মন্ত্রী তো বললেন, ‘দেশের মানুষ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে ঈদ পালন করছে।’ কথাটা টেলিভিশনের স্ক্রলে বার বার ফিরে আসছিল। ফলে ভাবনার জানালায় টোকা পড়লো। ঈদ নিয়ে এত কথা থাকতে মন্ত্রী মহোদয় কেন বললেন, দেশের মানুষ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে ঈদ পালন করছে? প্রশ্ন জাগে, আগে কি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছিল না? কি কি থাকলে পরিবেশ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক হয়? যা যা থাকলে দেশের পরিবেশ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক হয়, সে পথেই হাঁটবে বর্তমান সরকার। মন্ত্রী মহোদয়ের এমন বার্তা আমাদের মনে থাকবে। মন্ত্রী মহোদয়ের কথাতো মন্দ নয়, তবে বক্তব্যটা রাজনৈতিক। নতুন সরকারের পথ চলাতো এখনো সেভাবে শুরুই হয়নি, সামনের দিনগুলোতে উপলব্ধি করা যাবে দেশের সব মানুষ কতটা মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে ঈদ উযাপনে সক্ষম হয়।
বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে মন্ত্রী মহোদয় তো স্বাধীন। মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত ভালো বক্তব্যই রাখেন। তবে ভালো ও উত্তম বক্তব্যের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। যথাসময়ে যথাবিষয়ে বক্তব্য, যথাযথ ও তাৎপর্যপূর্ণ হলে তা উত্তম হয়। ফলে ঈদের সময় মন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্যকে উত্তম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মন্ত্রীদের উত্তম বক্তব্যই আমরা কামনা করবো। ঈদ উপলক্ষে মন্ত্রীর বক্তব্য আরো প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারতো। ঈদের সুনির্দিষ্ট বার্তা রয়েছে, যে রোজাকে কেন্দ্র করে ঈদ সেই রোজার স্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। সেই লক্ষ্য ও বার্তা এড়িয়ে যাওয়া কোনো ভালো লক্ষণ নয়। শুধু মন্ত্রী কেন, আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্যও তেমন আশাপ্রদ কিছু নয়। তারা যখন বলেন, ‘রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে’, কিংবা ‘হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়তে হবে’Ñ তখন কেমন লাগে? প্রথা-প্রচলন হিসেবে এসব বক্তব্য মন্দ নয়, বরং ভালোই। কিন্তু সময়ের পাটাতনে দাঁড়িয়ে তাদের বক্তব্য কি আরো সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট হতে পারতো না? এখানে কি চিন্তা ও গবেষণার কোনো অভাব রয়েছে? জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার নিরিখে রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচি নির্ধরণে কোনো দুর্বলতা নেই তো?
প্রিয় স্বদেশে রাজনীতির চর্চা বেশি হয়, সংস্কৃতির চর্চাও কম নয়। এক চাকায় দেশ চলে না, সংস্কৃতির চাকাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বেবিচেনার বিষয় হলো, দেশের সংস্কৃতির চালচিত্রটা কেমন? গণমাধ্যমের প্রোপাগা-ায় এমন একটা ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, বিনোদন সংস্কৃতিই যেন আমাদের মূল সংস্কৃতি। অথচ এটি জাতির ব্যাপক সাংস্কৃতিক ভুবনের একটি খ-িত অংশ মাত্র। আর দেশের টেলিবিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এবং আয়োজনে বিনোদন সংস্কৃতির নামে যা প্রদর্শিত হয়, নানা কারণেই তা প্রশ্নবিদ্ধ। এসব অনুষ্ঠানে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি ও মহলের বিতর্কিত ভাবধারার প্রাবল্য লক্ষ্য করা গেলেও দেশের মানুষের বোধ-বিশ^াস এবং আশা-আকাক্সক্ষার তেমন প্রতিফলন ঘটে না। শিল্পকলার মোড়কে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটা চাতুর্য এখানে চলে। বিষয়টিকে গণবিরোধী তৎপরতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। প্রসঙ্গত এখানে টেলিভিশনের ঈদ-অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলতে হয়।
টেলিবিশনের সপ্তাহব্যাপী ঈদ-অনুষ্ঠানে কি প্রদর্শিত হয়? ঈদ অনুষ্ঠান তো বিষয়-বিচ্ছিন্ন কোনো অনুষ্ঠান হওয়ার কথা নয়। আমরা জানি, শাওয়াল মাসে ঈদের চাঁদ ওঠার আগে রমযান মাসে রোজার চাঁদ উঠে থাকে। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলিম জনগণ ঈদের চাঁদ দেখে এবং পালন করে ঈদ-উৎসব। রোজার কারণেই ঈদ এবং ঈদে খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দই সব নয়, এর শুরুটা হয় সালাত দিয়েই। আর ঈদের সালাতের আগেই দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ কতে হয় ফিতরা, যাতে তারাও শরিক হতে পারে ঈদের আনন্দে। উপলব্ধি করা যায়, ঈদের বিধানের মধ্যেই রয়েছে ইবাদত, আনন্দ এবং সবাইকে নিয়ে দরদি সমাজ গঠনের বার্তা। প্রশ্ন হলো, ঈদের এমন বার্তা দেশের টেলিভিশনের ঈদ-অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য আয়োজনে কতটা প্রতিফলিত হয়? বরং লক্ষ্য করা যায় ভিন্ন চিত্র। কেউ যদি বলেন, রমযানের পুরো মাসে মানুষের মধ্যে ইবাদত-বন্দেগি, সংযম, দান-দরদ ও উন্নত নৈতিক চেতনার যে বিকাশ লক্ষ্য করা যায়; তা নষ্ট করার উদ্দেশেই যেন নির্মিত হয় টেলিভিশনগুলোর তথাকথিত ঈদ-অনুষ্ঠান। এমন বক্তব্য খ-ন করার মতো যৌক্তিক উদাহরণ সংশ্লিষ্টরা পেশ করতে পারবেন কী? সেক্যুলার চেতনার যেসব ব্যক্তিবর্গ ঈদ-অনুষ্ঠান নির্মাণের দায়িত্ব পালন করেন, তারা কি সিয়াম ও ঈদের বিধান এবং বার্তা সম্পর্কে অবগত আছেন? অবগত থাকলে তো ঈদ-অনুষ্ঠানের রূপ এমন হতো না। অবশ্য ব্যতিক্রম কিছু অনুষ্ঠানও লক্ষ্য করা যায়, যা সিয়াম ও ঈদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সাংস্কৃতিক সচেতনতার জন্য তাদের জানাই ধন্যবাদ। তবে ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই। জনগণের বোধ-বিশ্বাস ও আশা-আকাক্সক্ষার নিরিখে বিনোদন-সংস্কৃতির ধারায় প্রয়োজন মৌলিক ও ব্যাপক পরিবর্তন। টেলিভিশনের ঈদ অনুষ্ঠানে এখানে একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শুরুতেই বলেছিলাম, বিনোদন-সংস্কৃতি জাতির ব্যাপক সাংস্কৃতিক ভুবনের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানুষের বোধ-বিশ্বাস ও আশা-আকাক্সক্ষার রূপময় প্রকাশই হলো মানুষের পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি। এখানে ধর্ম-দর্শন, ইবাদত-বন্দেগি, খাদ্যাভাস, পোশাক-আশাক, বিয়ে-শাদী, আনন্দ-বিনোদন, খেলাধুলা, উপার্জন-ব্যয়, ব্যাবসা-বণিজ্য, হালাল-হারাম সবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। উপলব্ধি করা যায়, সব মানুষের সংস্কৃতি একরকম হবে না। কালচারাল ফিউসন বা মিশ্রণও হবে না। যেটা হবে সেটা হলো , ‘কালচারাল ফেডারেশন’ যার যার ধর্ম-সংস্কৃতি সে সে পালন করবে। এখানে গোঁজামিল বা জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। ‘বৈচিত্র্যের ঐক্যচেতনাই’ এখানে সমুন্নত হবে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়, Unity in diversity এটাই জাতি-রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।