॥ আমানুর রহমান ॥

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার পটপরিবর্তন বা নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ সবসময়ই নাগরিকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন দেশবাসীর মনেও অজস্র প্রত্যাশা দানা বেঁধেছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন এসব দাবি সব সময়ই থাকে। তবে এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে একটি সুস্থ, সভ্য ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য বর্তমান সময়ে জাতির সবচেয়ে জোরালো এবং প্রথম প্রত্যাশা হলো একটি ‘ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ’। নারী ও শিশুর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত টেকসই বা অর্থবহ হতে পারে না।বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ যেন একটি গভীর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের পর্দা খুললেই প্রায়শই এমন নির্মম ঘটনার খবর চোখে পড়ে, যা পুরো বিবেকবান সমাজকে স্তব্ধ করে দেয়। ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, কর্মস্থলে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ ভয়ের সংস্কৃতি কেবল নারীদের স্বাভাবিক চলাফেরা ও অগ্রগতিকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকারকেও চরমভাবে ক্ষুণœ করছে। বিগত দিনগুলোতে দেশের মানুষ দেখেছে, অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক, আর্থিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। বিচারহীনতার এ সংস্কৃতিই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

তাই নতুন সরকারের কাছে মানুষের মূল দাবি হলো-অপরাধীর কোনো দলীয় বা সামাজিক পরিচয় থাকবে না; রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী শুধুই অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে হবে।একটি ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে হলে কেবল কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সেই আইনের কঠোর, নিরপেক্ষ ও দ্রুত প্রয়োগ। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে বেশ কিছু কঠোর আইন থাকলেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব এবং ভুক্তভোগীকেই উল্টো দোষারোপ করার সংস্কৃতির কারণে অনেক অপরাধীই সাজার আওতার বাইরে থেকে যায়। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জাতির জোরালো প্রত্যাশা, তিনি দেশের বিচার ও শাসনব্যবস্থায় এমন কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেবেন যাতে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলাগুলো একটি নির্দিষ্ট ও স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়ার আইনি ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যাতে কোনো ভুক্তভোগী বিচার চাইতে গিয়ে থানা বা আদালতে নতুন করে কোনো হয়রানির শিকার না হন।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ নির্মূলে কঠোর শাস্তির পাশাপাশি আমাদের সমাজের মজ্জায় মিশে থাকা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন জরুরি। নতুন সরকারের কাছে বড় প্রত্যাশা হলো, তারা কেবল পাঠ্যপুস্তকেই নয়, বরং প্রতিটি শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশে এমন এক সংস্কার আনবে যেখানে নারী-পুরুষের ব্যবধান ঘুচিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রধান হয়ে ওঠে। নারীকে কেবল ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার বস্তু হিসেবে না দেখে, তাকে একজন মানুষ এবং সমান অধিকারসম্পন্ন সত্তা হিসেবে গণ্য করার শিক্ষা শৈশব থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি সমাজ ও গণমাধ্যমে এমন এক জোরালো জনমত গড়ে তুলতে হবে, যা নারীর প্রতি যে কোনো অবমাননাকর আচরণকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে। আইনের শাসন যখন সুস্থ পারিবারিক শিক্ষা আর উন্নত মানসিকতার সাথে মিলেমিশে একাকার হবে, তখনই আমরা একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ উপহার পাব।

জিডিপি বা অর্থনৈতিক সূচকে একটি দেশ কতটা এগোলো, তার চেয়েও বড় মাপকাঠি হলো সেই দেশের মানুষ কতটা নিরাপদ। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন এক ঐতিহাসিক সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো নারীকে রাতের অন্ধকারে একা চলতে ভয় পেতে হবে না, কোনো অভিভাবককে তার সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হবে না। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশের কোনো বিকল্প নেই। নাগরিকদের জীবনের এ মৌলিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই নতুন সরকার সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আস্থার জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে। লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।