মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন
কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, আবৃত্তি শিল্পী, ক্বারী, ভাষাতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, গীতিকার, সুরকার ও সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান নিজামী (১৯৭১-২০২৬) ছিলেন এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী মনন, ইসলামী মূল্যবোধ ও গভীর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক বহুমুখী প্রতিভা। সৃজনশীল অভিব্যক্তির বহুরূপী কাব্যিক অনুসন্ধান ও ভাষাগত বৈচিত্র্য তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। গুণীজনদের মতে, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যে বানান সংস্কার ও গবেষণার উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার লেখায় অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা ও সমসাময়িক সমস্যার সার্থক প্রতিফলন ঘটত। কবি আল মাহমুদ জীবিতকালে মাহমুদুল হাসান নিজামীকে তাঁর ‘বন্ধুবর’ এবং ‘প্রিয় ভাই’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং একজন শুভানুধ্যায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক সময় কবি লেখেনÑ
“মুছে যাবো আমি যখন
ধরাধামের পাতা থেকে
আকাশ জমিন থাকবে সবি
অক্ষিস্মৃতি রেখো এঁকে
তোমরা কেহ ভুল বুঝিলে
নিও তবে শুদ্ধ করে
রোজ কটি ছন্দ পেলে
শান্তি মিলে কবির ঘরে।”
“শান্তি মিলে কবির ঘরে” শীর্ষক কবিতার এ পঙ্ক্তিগুলো কবি লিখেছেন ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫-এ তাঁর ফেসবুক ওয়ালে। সত্যি কবি নশ্বর ধরাধামের পাতা থেকে চিরতরে মুছে গেছেন, রেখে গেছেন প্রজন্মের জন্য স্মৃতির আলপথ। এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম।
কবির জন্ম ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়ায়। পিতা: মাওলানা আবদুল্লাহ্ ছিলেন সুপরিচিত একজন আলেম, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। মাতা: মায়মুনা খাতুন ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও স্নেহময়ী গৃহিণী। ১৯৮৪ সালে ‘দৈনিক নয়া বাংলা’য় প্রকাশিত কিশোর কবিতার মাধ্যমে তাঁর লেখালেখির যাত্রা শুরু। তাঁর সাহিত্যজীবন ছিলো অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদ মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৪০টি। এ ছাড়াও তিনি পাঁচ হাজারেরও বেশি কবিতা ও গান রচনা করেছেন। কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী বর্তমান সময়ে বাংলা সাহিত্যে অতি পরিচিত একটি নাম। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, গীতিকার, আবৃত্তি শিল্পী, ক্বারী ও সাংবাদিকের মতো বিরল প্রতিভা ও গুণের অধিকারী হওয়ার ভিতর দিয়ে তাঁর পরিচিতি ও ব্যক্তিত্বের প্রসার ঘটে।
নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি বাবার সাথে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। অতঃপর উচ্চতর এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর বাবা শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসায়ও জড়িত ছিলেন। আশির দশকে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় তাঁর পিতার একটি ব্যবসাকেন্দ্র ছিলো। সেখানে ‘তিরয়াক’ (ঞরৎধশ) নামক বহুরোগ নিরাময়ী ইউনানী ঔষধ পাওয়া যেতো। বিশেষ করে এ ঔষধটি নকখুনী, পুরানো ক্ষত বা গ্যাংরিং থেকে আরোগ্য লাভের জন্য সে সময়কার অব্যর্থ ঔষধ ছিলো। কবি তাঁর বাবাকে ব্যবসায় সাহায্য করতেন।
জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেছেন। যদিও জন্ম চট্টগ্রামে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার সদর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। সেখানেই গড়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র। অতঃপর সাহিত্যিক হিসেবে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন ‘কবিতাবাড়ি’, ৫৮/১ এ পুরানা পল্টন, ঢাকায়।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিজামীর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যপ্রীতি ও ভাষা শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। স্কুলজীবন থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন এবং নতুন ভাষা শেখার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ দেখাতেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তাঁর মনে কবিতার প্রতি অসাধারণ অনুরাগ জন্ম নেয়। সেই থেকে নিরলস লিখে গেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কবিতা ছাড়াও তিনি সাহিত্যের অন্যান্য বিষয় অবলম্বনে বহু মূলবান গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। সেসব উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছেÑ ‘ইবনে খালদুনের কাব্যতত্ত্ব ও আরব রোমান্স কবিরা’, ‘নজরুলের পত্র সংকলন ও বাংলাদেশের কবিস্মৃতি’ এবং ‘ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মবিশ্বাস’।
বিশ্ব সাহিত্যের শেখ সাদী, ফরিদ উদ্দিন আত্তার ও ইমরুল কায়েসের কবিতাগুলোর বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম কাব্যানুবাদ তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পর আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজিসহ বহু ভাষা জানা মানুষ মাহমুদুল হাসান নিজামী ছাড়া দ্বিতীয়জন পাওয়া দুষ্কর। বহু ভাষার অলংকারে মাহমুদুল হাসান নিজামীর লেখা কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যে নবসংযোজন সৃষ্টি করেছে। ‘জাতীয় কবিতা মঞ্চে’র প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান নিজামী বাংলা সাহিত্য ও বানান সংস্কারের নবধারা তৈরিতে অনিবার্য প্রাণপুরুষ। তিনি জাতীয় সাংবাদিক মঞ্চের সভাপতিও ছিলেন।
জ্ঞানের এমন শাখা নেই যে বিষয়ে কবি নিজামী লিখেননি। তাঁর লেখা শতাধিক বই যার বিষয়বস্তু একটি থেকে আরেকটি সম্পুর্ণ ভিন্ন। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু ছিল বিস্তৃত প্রেম, প্রকৃতি, ইতিহাস, দর্শন, মানবতা, সমাজের অসঙ্গতি, প্রতিবাদ ও মানবিক চেতনা। শব্দের নান্দনিক ব্যবহার ও গভীর ভাবনায় তিনি পাঠকের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সাহিত্যের প্রায় সব শাখা তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। যেমন: অনুবাদ কবিতায়Ñ ‘পান্দেনামা’ ফরিদুদ্দীন আত্তার, ‘মহাকবি শেখ সাদী’র কালজয়ী গ্রন্থ ‘গুলিস্তাঁ ও ‘বোস্তাঁ; ছড়া- ‘ছড়া সমগ্র-১; রোমান্টিক কবিতাÑ ‘কুমারী হাত, ‘হাজারো বছরের সেরা প্রেমকাব্য- ‘মুয়াল্লাকাত’, রোমান্টিক কবিতা সর্বানী’; সীরাত গ্রন্থÑ ‘কার্টেসি গ্রেটনেস এন্ড স্মার্টনেস অব মুহাম্মদ (সা.)’, ‘নবীজি মুহাম্মদ (সা.) জীবনী রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক অবকাঠামো’, ‘মুহাম্মদ (সা.)-এর বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক দর্শন’; ইতিহাস-ঐতিহ্য : গবেষণা ও প্রবন্ধগ্রন্থÑ ‘ধর্ম উৎপত্তির ইতিহাস’, ‘যেভাবে স্বাধীনতা হারালো স্বাধীনদেশ সিকিম ও হায়দারাবাদ’; ইসলামী অনুবাদ গ্রন্থÑ ওমর খৈয়ামের ‘শরাবের পেয়ালা’, ‘কারীমা ও মজার গল্প’; ঔপনিবেশিক কাল ও ভারত বিভাগÑ ‘ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের নির্মমতার ইতিহাস’, ‘১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে ইংরেজদের নির্মমতার ইতিহাস’; ডায়েরি ও চিঠিপত্র সংকলনÑ ‘নজরুলের পত্র সংকলন’, ‘নজরুলের পত্র সংকলন ও বাংলাদেশের কবিস্মৃতি’; নবী-রাসুল, সাহাবা, তাবেই ও অলি-আওলিয়াÑ ‘পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও নবীদের গল্প’, ‘রাসুলুল্লাহ্ (সা.)-এর শত মুজেযা ও মুসলিম বিশ্ব’; রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বÑ ‘স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সংস্কার শাসন ও উন্নয়ন’, ‘কবি-সাহিত্যিকদের মূল্যায়নে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’; শিশু-কিশোর গল্পÑ ‘শেখ সাদীর মজার মজার গল্প’, ‘মধ্যরাতের দেওদৈত্য’, ‘ভূতের দেশ : কালো পাহাড়’; সাহিত্য ও সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধÑ ‘সাহিত্যের ক্লাস ও সাহিত্যকোষ’, ‘সাহিত্য পরিচয়’; আধ্যাত্মিকা ও সুফিবাদÑ ‘দেহতত্ত্ব ও মন’; ইসলামী অঞ্চল, শাসন ব্যবস্থা ও রাজনীতিÑ ‘মহানবির রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন পত্র সনদ সন্ধি ভাষণ’; ইসলামী ইতিহাসÑ ‘বিশ্বময় মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস’; ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বÑ ‘বেগম রোকেয়া ও বৃটিশ বিরোধী মুক্তিযোদ্ধা শহীদ লালবিবি’; কাব্য সমালোচনাÑ ‘ইবনে খালদুনের কাব্যতত্ত্ব ও আরব রোমান্স কবিরা’; নারী জীবনীÑ ‘নারীতত্ত্ব ও নারীর মন বিখ্যাত নারীদের বহুগামী জীবন’; প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসÑ ‘প্রাচীন মানব সভ্যতার ইতিহাস’; ভাষা বিষয়ক গবেষণা, প্রবন্ধ ও সমালোচনাÑ ‘ভাষাতত্ত্ব-ভাষার উৎপত্তি’; মুক্তি যুদ্ধের গল্পÑ ‘ইতিহাসের গল্প মুক্তিযুদ্ধের গল্প’; রাজনৈতিক ইতিহাসÑ ‘বিশ্ব রাজনীতির চার হাজার বছর’; স্বাস্থ্য বিষয়ক বিবিধ বইÑ ‘দেহতত্ত্ব-মন ও নারী-পুরুষের সৃষ্টিগত ভিন্নতা’ ইত্যাদি সহ আরও বিবিধ বিষয়ে তাঁর লেখায় বাংলা ভাষা আজ বহুলাংশে ঋদ্ধ। মাহমুদুল হাসান নিজামীর সাহিত্যজীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক।
কবির ভাষায়Ñ ‘মনের রঙে শব্দের তুলিতে ব্যক্তিগত অনুভবের চিত্রগুলো সাজিয়ে নিলাম কবিতার অবয়বে, ফেসবুকসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত কবিতাগুলি আমার অনুভবের সন্তান, জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ পরিগঠন হয়েছে কবিতার শরীরে।’ মানবিক কবির বিখ্যাত একটি কবিতা স্মরণ করা যাকÑ
“পশু পাখি দানব নয়-মানুষ করতে খতম
মানুষ বানায় মারণাস্ত্র গোলা বারুদ এটম
ক্ষুধার জ্বালায় শিকার করে এক পশু অন্যকে
কিসের ক্ষুধায় মানুষ মারিস মানুষরে তুই মানুষকে
ক্ষেপণাস্ত্র গোলা বারুদ মানুষ মারতেই সব
হাজার কোটি ব্যয় করে মানুষ মারার উৎসব।”
মানুষ মারার উৎসবে, কবিতা সমগ্র-১
: মাহমুদুল হাসান নিজামী
কেবল লেখক হিসেবেই নয়, একজন সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি ‘জাতীয় কবিতা মঞ্চে’র মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কবিতা চর্চা বিস্তারে ভূমিকা রাখেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ‘দৈনিক ডেসটিনি’ এবং ‘দৈনিক দেশজগত’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত লেখাগুলোতে সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধের নানা দিক উঠে এসেছে। তাছাড়া নিজ এলাকায় স্কুল-কলেজসহ অসংখ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী।
কথাশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী আর আমাদের মাঝে নেই। রংপুরের সাংবাদিক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘নিজামী রংপুরের তারাগঞ্জে প্রায়ই বেড়াতে আসতেন। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ, ২০২৬) সকালে তারাগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাস ধরার জন্য বের হওয়ার সময় অসুস্থ হলে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।’
৭ মার্চ সকাল ৯টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে, বাদ মাগরিব, কাউখালী উপজেলা কমপ্লেক্স মাঠ, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় এবং বাদ এশা চট্টগ্রাম নগরীর ‘জামিয়াতুল উলূম আল-ইসলামিয়া লালখান বাজার’ মাদরাসা মাঠে পরপর তিনটি জানাজা শেষে তাঁকে কাউখালী পারিবারিক কবরস্থানে মাবা-বাবার পাশে চির শায়িত করা হয়।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর কবিতা, অনুবাদ, গবেষণা ও চিন্তার আলোয় বাংলা সাহিত্যের আকাশে দীর্ঘদিন জ্বলতে থাকবে তাঁর স্মৃতি। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবেÑ এটাই আমাদের প্রত্যাশা। মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় মহান আল্লাহ্র কাছে সবিনয় দোয়া রইলো নিরন্তর।