মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, যা বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যখন ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হায়েনার মতো অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে, তখন এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ বাধ্য হয়েই সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ঘোষিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কিন্তু‘ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এই অভ্যুদয় কেবল নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আকস্মিক কোনো ফসল ছিল না; বরং এর পেছনে রয়েছে এদেশের মানুষের দীর্ঘকালের স্বাধীনচেতা মানসিকতা এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা শোষণমুক্তির ধারাবাহিক সংগ্রাম। বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান, এর নদ-নদী বিধৌত পলিমাটির প্রকৃতি যেমন এদেশের মানুষকে যুগে যুগে স্বাধীন ও বিদ্রোহী করে তুলেছে, তেমনি এই অঞ্চলে ইসলামের আগমন এবং এর সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার শাশ্বত বাণী এদেশের মানুষের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষাকে একটি সুদৃঢ় আদর্শিক ভিত্তি প্রদান করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের শোষণ ও গণহত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করলেও, প্রকৃতপক্ষে বাংলার মুসলমানরা ইসলামের মূল চেতনা-অর্থাৎ জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠাকে ধারণ করেই স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াই করেছিল। বাংলার বুকে ইসলামের আগমন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত এদেশের মানুষের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের যে সুদীর্ঘ ইতিহাস, তা মূলত পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মানুষের জন্মগত অধিকার আদায়ের এক ধারাবাহিক ও তাত্ত্বিক সংগ্রাম।
এই অঞ্চলে ইসলামের বার্তা আসার সময় থেকেই এখানকার মানুষ ধীরে ধীরে একটি নতুন ও শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। প্রাচীন বাংলায় পাল রাজবংশের দীর্ঘ শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজারা তুলনামূলকভাবে একটি স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা গড়ে তুললেও, পরবর্তী সময়ে সেন রাজবংশের শাসনামলে বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের অন্ধকার। সেন রাজাদের প্রবর্তিত কঠোর কৌলীন্য প্রথা এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সমাজের নি¤œবর্ণের সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়। ঠিক এমন একটি সময়ে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে মুসলিম রাজনৈতিক ক্ষমতার সূত্রপাত ঘটে। তবে রাজনৈতিক বিজয়ের বহু আগে থেকেই সুফি-দরবেশদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী পৌঁছাতে শুরু করেছিল। সেন আমলের সামাজিক বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ যখন দেখল যে ইসলামে উঁচু-নিচু, ব্রাহ্মণ-শূদ্র বা শাসক-শাসিতের কোনো ভেদাভেদ নেই এবং স্রষ্টার কাছে সকল মানুষ সমান, তখন তারা ব্যাপকভাবে ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই নতুন ধর্মে আশ্রয় গ্রহণ করে।১ মূলত এ ভূখণ্ডে মানুষের দলে দলে ইসলাম গ্রহণের প্রধান কারণ কোনো তরবারির জোর ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার প্রতি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসমর্পণ। ইসলামের এই সাম্যবাদী চেতনাই বাংলার সাধারণ মানুষকে প্রথম একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সত্তার ধারণা প্রদান করে, যা পরবর্তীকালে তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে জাগ্রত করেছিল।
সামাজিক স্বাধীনতার এই আকাক্সক্ষা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার রূপ লাভ করতে থাকে। মুসলিম শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলা দিল্লির সুলতানদের অধীনস’’ একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হলেও, দিল্লির কেন্দ্র থেকে বাংলার দূরবর্তী অবস্থান এবং এদেশের স্বাধীনচেতা মানুষের কারণে প্রায়শই বিদ্রোহ সংঘটিত হতো। এই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সুপ্ত আকাক্সক্ষা পূর্ণতা লাভ করে চতুর্দশ শতাব্দীতে, সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের হাত ধরে। ১৩৫২ সালে ইলিয়াস শাহ বাংলার তিনটি প্রধান জনপদ-রাঢ়, বরেন্দ্র এবং বঙ্গকে একত্রিত করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। তিনি প্রথমবারের মতো নিজেকে ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ বা বাঙালিদের সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সমগ্র স্বাধীন ভূখণ্ডের নামকরণ করেন ‘বাঙ্গালাহ’।২ শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের মাধ্যমেই মূলত আধুনিক স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিমূল স্থাপিত হয়েছিল। ইলিয়াস শাহ বাংলার রাজধানী হিসেবে পাণ্ডুয়াকে নির্বাচিত করলেও, তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলার সীমানায় ঢাকা ও সোনারগাঁওয়ের মতো অঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ইলিয়াস শাহ এবং তাঁর পরবর্তী স্বাধীন সুলতানদের প্রায় দুই শতকের শাসনামলকে বাংলার ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই সময়ে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে একটি অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি হয় এবং বাংলার মানুষ দিল্লির আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের শিল্প, সাহিত্য ও অর্থনীতির বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পায়। স্বাধীন সুলতানি আমলের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বাংলার মুসলমানরা কখনোই বহিঃশত্রুর পরাধীনতা মেনে নিতে রাজি ছিল না।
পরবর্তীকালে মোগল সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের সময়ও বাংলার স্বাধীনচেতা মানুষ সহজে দিল্লির বশ্যতা স্বীকার করেনি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে এবং সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার সোনারগাঁও এবং ভাটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ঈশা খাঁ, মুসা খাঁ এবং অন্যান্য বারো ভূঁইয়ারা মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। বারো ভূঁইয়ারা মূলত বাংলার স্থানীয় জমিদার ও শাসক ছিলেন, যাদের মধ্যে মুসলমান এবং হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের নেতাই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণœ হবে। তাই তাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাপতি ইসলাম খানের কাছে বারো ভূঁইয়াদের পতন ঘটে এবং ১৬১০ সালে ঢাকাকে মোগল সুবাহ বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করে এর নাম দেওয়া হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’, তবুও এই অঞ্চলটি সম্পূর্ণভাবে মোগলদের দাসে পরিণত হয়নি। মোগল শাসনামলে ঢাকা, সোনারগাঁওসহ বিভিন্ন অঞ্চল মুসলমানদের দ্বারা শাসিত হলেও, দিল্লির সরাসরি নিয়ন্ত্রণের কারণে সেগুলো পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না। তবে মোগল সুবাদার এবং পরবর্তীকালে বাংলার স্বাধীন নবাবদের আমলে বাংলা পুনরায় স্বকীয়তা লাভ করতে শুরু করে। বিশেষ করে নবাব মুর্শিদকুলি খানের সময় থেকে বাংলা কার্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই পরিচালিত হতে থাকে, যেখানে দিল্লির সম্রাটের কর্তৃত্ব কেবল নামেমাত্র টিকে ছিল।৩
কিন্তু‘ বাংলার মুসলমানদের এই আপেক্ষিক স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির সূর্য অস্তমিত হয় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ক্লাইভের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মর্মান্তিক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য প্রায় দুই শতাব্দীর জন্য অস্তমিত হয়ে যায়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার এই পরাজয় কেবল একজন শাসকের পতন ছিল না, এটি ছিল বাংলার সমগ্র মুসলিম সমাজের দীর্ঘ এক অন্ধকার যুগে প্রবেশের সূচনা। পলাশীর বিপর্যয়ের পর ইংরেজরা বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা সুপরিকল্পিতভাবে বাংলার মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ আইন বাংলার ভূমি ব্যবস্থায় এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। এই আইনের ফলে যুগে যুগে যারা জমির মালিক ছিল, সেই মুসলিম জমিদার ও কৃষকদের রাতারাতি ভূমিহীন করে ইংরেজদের অনুগত এক নতুন হিন্দু জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি করা হয়। পাশাপাশি ফারসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে মুসলিম সমাজ ব্যাপকভাবে সরকারি চাকরি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে। অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতার এই দীর্ঘ পরাধীনতার যুগে বাংলার মুসলমানরা চরম হতাশা ও অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হয়।
তবে এই ঘোর অমানিশার মধ্যেও বাংলার মুসলমানরা পরাধীনতাকে বিনাবাক্যে মেনে নেয়নি। ইসলামের স্বাধীনতা ও জুলুম-বিরোধী চেতনাকে ধারণ করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার বুকে একাধিক শক্তিশালী কৃষক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের জন্ম হয়, যা প্রকারান্তরে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নিয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মীর নিসার আলী উরফে তিতুমীরের সংগ্রাম এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন। তিতুমীর কেবল একজন আধ্যাত্মিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইংরেজদের মদদপুষ্ট অত্যাচারী দেশীয় জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষকদের সংঘবদ্ধ করার এক মহান রূপকার। ১৮৩১ সালে তিনি নারিকেলবাড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে স্বাধীন বাংলার ঘোষণা দেন এবং ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। যদিও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনীর কামানের গোলার সামনে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা টিকতে পারেনি এবং তিনি শাহাদাত বরণ করেন, তবুও তাঁর এই আত্মত্যাগ বাংলার মুসলমানদের হৃদয়ে স্বাধীনতার যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, তা কখনো নিভে যায়নি। অন্যদিকে, হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলনের মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ হলো ‘দারুল হারব’ বা শত্রুভাবাপন্ন দেশ। ইসলামের বিধান অনুযায়ী একটি পরাধীন দেশে যেখানে মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নেই, সেখানে জুমার নামাজ পড়া জায়েজ নয়-এই ফতোয়া জারি করে তিনি মূলত ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক চরম অসহযোগ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন। তিতুমীর ও শরীয়তুল্লাহরা সাময়িকভাবে সফল হতে না পারলেও, তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে ইসলামের শাশ্বত আদর্শ বাংলার মুসলমানদের পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করার অফুরন্ত প্রেরণা জোগায়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংগ্রাম শুরু হয়। দীর্ঘ বঞ্চনার পর পূর্ব বাংলার অবহেলিত মুসলমানদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে এবং ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের সিদ্ধান্তে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয়। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়, যার রাজধানী হয় ঢাকা। এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘকাল পর ঢাকার হারানো গৌরব ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের এক নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। নবাব সলিমুল্লাহ বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক সত্তা ছাড়া পূর্ব বাংলার দরিদ্র ও শোষিত মুসলমানদের মুক্তি সম্ভব নয়। বঙ্গভঙ্গ সাময়িকভাবে সফলও হয়েছিল এবং এর ফলে পূর্ব বাংলায় স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট ও প্রশাসনিক ভবনের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটতে শুরু করে। কিন্তু পূর্ব বাংলার এই অগ্রগতি কলকাতার উচ্ছবর্ণের হিন্দু জমিদার, বুদ্ধিজীবী ও এলিট শ্রেণির স্বার্থে চরম আঘাত হানে। তারা বঙ্গভঙ্গকে ‘মাতৃভূমির অঙ্গচ্ছেদ’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে তীব্র স্বদেশি ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন শুরু করে। নানা ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার ও উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতাদের ক্রমাগত চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকার টিকতে না পেরে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। বঙ্গভঙ্গ রদের এই ঘটনা বাংলার মুসলমানদের গভীরভাবে হতাশ করে এবং তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অখ- ভারতে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কখনোই সুরক্ষিত থাকবে না। এই উপলব্ধি থেকেই মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক ও স্বাধীন আবাসভূমির চেতনা প্রবল হতে শুরু করে, যার বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯০৬ সালে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বেই ‘সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।৭
বঙ্গভঙ্গ রদের পর থেকে বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক যাত্রাপথ সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি তারা নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যেখানে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে নিয়ে একাধিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র (Independent States) গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এই লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল। বাংলার সাধারণ মুসলমানরা একটি শোষণমুক্ত, স্বাধীন এবং নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার চর্চার নিরাপদ আবাসভূমির স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে যখন পাকিস্তানের জন্ম হয়, তখন পূর্ব বাংলার মুসলমানরা প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে নবগঠিত এই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে তারা অবশেষে দুই শতাব্দীর ইংরেজ শাসন এবং জমিদারদের অর্থনৈতিক শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু তাদের এই স্বপ্নভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
১৯৪৭ সালে স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাত্র পনেরো দিনের মাথায় পূর্ব বাংলার মানুষের সামনে ভাষা ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আসল চরিত্র উন্মোচিত হতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরেই যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, তখন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। অথচ তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশেরই মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে খোদ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে দম্ভভরে ঘোষণা করেন যে, “উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। জিন্নাহর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। বাংলার মুসলমানরা অতি দ্রুত উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, ইংরেজদের বিদায়ের পর তারা এখন নতুন এক ঔপনিবেশিক শক্তির খপ্পরে পড়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা ইসলামের ভ্রাতৃত্বের দোহাই দিয়ে যে রাষ্ট্রটি গঠন করেছিল, তা মূলত ছিল পূর্ব বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন এবং বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখার এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার এই সংগ্রাম চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসা ছাত্র-জনতার ওপর পাকিস্তানি পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেকেই শহিদ হন। বায়ান্নর এই ভাষা আন্দোলনই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী মাইলফলক। এর মধ্য দিয়েই মূলত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের খোলস ভেঙে ভাষাভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। বাঙালি বুঝতে পারে যে, কেবল মুসলমান হওয়ার কারণে তাদের অধিকার সুরক্ষিত নয়; বরং নিজেদের জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ভাষা রক্ষার জন্য তাদের পুনরায় এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস হলো চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের ইতিহাস। পাকিস্তানের তেইশ বছরের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করা হয়। শিল্প, বাণিজ্য, সামরিক বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন-সর্বত্র বাঙালিদের পরিকল্পিতভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। এই শোষণের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন, যা ছিল মূলত বাঙালিদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সনদ তথা ‘ম্যাগনাকার্টা’। ছয় দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকরা বিচ্ছিন্নতাবাদের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করে। কিš‘ ১৯৬৯ সালের প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হন। এরপর ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা থাকলেও, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান এবং পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। তারা ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে কীভাবে বাঙালিদের চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে ঘুমন্ত ও নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শুরু করে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। এই আক্রমণের পরপরই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।৯
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার এবং পরাধীনতা ও দাসত্ব হলো একটি অভিশাপ।
ইসলামি দর্শনে ‘হক’ বা অধিকার আদায় এবং ‘আদল’ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানি শোষকরা তেইশ বছর ধরে বাঙালিদের অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করে এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের দেওয়া রায়কে অস্বীকার করে চরম অন্যায় ও অবিচারের আশ্রয় নিয়েছিল। এমতাবস্থায়, নিজেদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা, আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রাখা এবং জালেমের হাত থেকে নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করার জন্য বাঙালি মুসলমানরা যে অস্ত্র ধারণ করেছিল, তা ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলামের জিহাদ বা ন্যায়যুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং মদিনায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং মাতৃভূমির প্রতিরক্ষার জন্য বদর, ওহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধগুলোতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত হাদিস, “নিজের জীবন, সম্পদ ও পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়, সে শহিদ”-এই বাণী একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম প্রেরণা জুগিয়েছিল। এদেশের অসংখ্য আলেম, পীর-মাশায়েখ ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কারণ তারা বিশ্বাস করতেন যে শোষক পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড লাভের যুদ্ধ নয়, বরং এটি হলো সত্য ও মিথ্যার, ন্যায় ও অন্যায়ের এক মহান লড়াই।
অধিকন্তু‘, ইসলাম কখনোই কোনো নির্দিষ্ট ভাষাকে বা সংস্কৃতিকে অন্য কোনো ভাষার ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়াকে সমর্থন করে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে ঘোষণা করেছেন যে, মানুষের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য তাঁরই অন্যতম নিদর্শন। সুতরাং মাতৃভাষা বাংলাকে মুছে দিয়ে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার যে অপচেষ্টা পাকিস্তানিরা করেছিল, তা ছিল সরাসরি স্রষ্টার প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ। এদেশের মুসলমানরা ইসলামের এই উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষাকে ধারণ করেই নিজেদের হাজার বছরের লালিত সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে রক্ষা করার জন্য জীবন দিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন এদেশের মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় আশ্রয় নেওয়া নিরীহ মানুষদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে, তখন তারা কেবল মানবাধিকারই লঙ্ঘন করেনি, বরং ইসলামের পবিত্রতাকেও চরমভাবে ভুলুণ্ঠিত করেছে। বিপরীতে, বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধকালীন সময়েও মানবিকতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তারা অকারণে বন্দি শত্রুসেনাদের ওপর অত্যাচার করেনি এবং যুদ্ধনীতি মেনে চলেছিল, যা ছিল ইসলামি শিষ্টাচারেরই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, শহিদের বুকের তাজা রক্ত এবং মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। স্বাধীন বাংলাদেশের এই অভ্যুদয় বিশ্ব মানচিত্রে কেবল একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মই ছিল না, এটি ছিল হাজার বছর ধরে বাংলার মানুষের অন্তরে লালিত স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। পাল ও সেন আমলের বর্ণবাদী নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ইসলামে আশ্রয় নেওয়া থেকে শুরু করে ইলিয়াস শাহের স্বাধীন বাঙ্গালাহ গঠন, বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধ, তিতুমীর ও শরীয়তুল্লাহর ধর্মভিত্তিক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে আত্মবিকাশের চেষ্টা এবং পরিশেষে পাকিস্তানের শোষণমুক্ত হওয়ার জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধÑএই সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রাপথে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। তা হলো, বাঙালি জাতি জন্মগতভাবেই স্বাধীনতাপ্রিয় এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষায় দীক্ষিত।
এই ঐতিহাসিক বিবর্তনে ইসলামের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও জুলুম-বিরোধী চেতনা সর্বদা একটি শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। যদিও একাত্তরের যুদ্ধটি সরাসরি ধর্মীয় আবরণে লড়া হয়নি এবং এর নেতৃত্বে ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল, তবুও এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জনসাধারণ মানুষের মানসপটে অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে নৈতিক শক্তি ও প্রেরণা, তা অনেকাংশেই প্রোথিত ছিল ইসলামের শাশ্বত শিক্ষার গভীরে। পাকিস্তানিরা ধর্মকে ব্যবহার করেছিল শোষণের হাতিয়ার হিসেবে, আর বাঙালিরা ধর্মকে ধারণ করেছিল আত্মরক্ষা ও ন্যায়বিচারের ঢাল হিসেবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস কেবল কিছু রাজনৈতিক ঘটনা বা সামরিক বিজয়ের দলিল নয়; এটি হলো মানুষের মুক্তি ও অধিকার আদায়ের এক তাত্ত্বিক ও আদর্শিক মহাকাব্য, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাক্সক্ষা এবং ইসলামের ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার মূল চেতনা এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে এবং জন্ম দিয়েছে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রÑবাংলাদেশ।
তথ্যসূত্র
১. মুহম্মদ আব্দুর রহিম, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস (ঢাকা: আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৭৬), ৪৫।
২. মুমতাযুর রহমান তরফদার, হুসেন শাহী আমলের বাংলা (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯৯), ১২০।
৩. সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.), বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, ১ম খ- (ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯২), ৫৫।
৪. সুপ্রকাশ রায়, ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম (কলকাতা: ডিএনবিএ ব্রাদার্স, ১৯৭২), ১৭৬।
৫. আবদুল মওদুদ, ওহাবী আন্দোলন (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮১), ৯৮।
৬. মুনতাসীর মামুন, বঙ্গভঙ্গ ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ (ঢাকা: প্যাপিরাস, ২০০৫), ৩৪।
৭. এ. কে. নাজমুল করিম, বাংলার মুসলিম সমাজ ও রাজনীতি (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯৩), ৮৭।
৮. বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, ১ম খ- (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৭০), ১১২।
৯. মঈদুল হাসান, মূলধারা ‘৭১ (ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৮৬), ২৫।
১০. আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩২।
১১. সালাহউদ্দীন আহমদ, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০১), ৬৫।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক,
ইংরেজি বিভাগ
নর্দান বিশ^বিদ্যালয় বাংলাদেশ।