ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ইতিহাস পঠিত হচ্ছে সর্বত্র। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জীবনসংগ্রামের বিভিন্ন পর্বের গতিবিধি নির্ণয় করার শিক্ষা মেলে। জীবন-সংকটে সামনে চলার প্রেরণা পাওয়া যায় এই মুক্তিযুদ্ধের বিজয় চেতনার নানা অনুসঙ্গ থেকে। তাইতো মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং প্রতিটি অঙ্গনে আমাদের আলোচনা পর্যালোচনা দরকার। প্রয়োজন ইতিহাসের নিরীখে নিজেদের কর্মপথ নির্ণয় করার। শিল্প-সাহিত্যের নান্দনিক অধ্যায়টিও যে আন্দোলন সংগ্রামের অনন্য উপাদান হতে পারে মুক্তিযুদ্ধকালীন সাংস্কৃতিক কর্মীদের কর্মতৎপরতা এবং কর্মপ্রেরণা বিশ্লেষণ করলে তা সহজেই অনুমেয়। সে সময়ের একেকটি গান যেন হাজারো বুলেটের চেয়ে শক্তিশালী। গানের প্রতিটি চরণ যেনো বারুদভরা গোলার সারি। একেকটি কবিতাপোস্টার আন্দোলনের কোটি মানুষের বিপ্লবী শ্লোগান। একেকটি কার্টুন এবং প্রতিবাদলিপি যেনো স্বৈরাচারের আতঙ্ক-স্কোয়াড। মূলত সাংস্কৃতিক কর্মীরাই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন জাগানিয়া প্রভাতপাখি; বিজয় নেশার মহৌষধ। স্বাধীনতার দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে চব্বিশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বাংলার কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক-ছাত্র, চাকরিজীবী-পেশাজীবী, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ, কিশোরী-বালিকা-পৌঢ়া, জাতি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অবদান রয়েছে। সকলের ভেতরেই জেগে উঠেছিলো দেশপ্রেম। সকলের চোখে মুখে একটাই স্বপ্ন; মুক্তিচাই, স্বাধীনতা চাই। এই গণ-চেতনা জাগিয়ে তুলে যুদ্ধের স্পিরিট ছড়িয়ে দিতে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিগণ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। যিনি যেভাবে পেরেছেন তার জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে। লেখক, গায়ক, কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবী নিজেদের মতো করে বিজয়ের জন্য কাজ করেছেন। শিল্পী গায়কেরা গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত করেছেন। চারুশিল্পী সমাজ এগিয়ে আসেন মহান মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধা হিসেবে হাতে রংতুলির অস্ত্র নিয়ে। সাহিত্যিক-সাংবাদিকের কলম থেকে নেমে আসে বিপ্লবী ভাষা; প্রতিটি শব্দ-পঙক্তি হয়ে উঠে মুক্তি মিছিলের সাহসী শ্লোগান।

আন্দোলন সংগ্রামে শিল্প-সংস্কৃতির সাফল্যের ইতিহাস একদিনে রচিত হয় না। পরিকল্পিত উপায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যার যুগ পেরিয়ে বিজয়ের আলো বিকশিত হতে থাকে। অনেক সময় একটি জেনারেশন পেরিয়ে যায় সাফল্যের আলো পেতে। এ জন্য সবর দরকার। দরকার নিরবিচ্ছিন একাগ্রতা, পরিবেশের আলোকে পরিকল্পিত চিত্রকল্প নির্মাণ এবং স্বপ্নময় সাহসী কর্মতৎরতা। বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মতৎপরতা শুরু হয়েছিলো উনিশ‘শ সাতচল্লিশের আগে থেকেই। সে চেতনায় ছিলো বিশ্বাসী ধারার সুবাস। সাতচল্লিশের পর থেকে নতুন চেতনার যাত্রা শুরু হয়। ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম প্রয়াস চালিয়ে যান। ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে আটান্ন সালের সামরিক শাসন এবং ষাট দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চাও চলতে থাকে পরিকল্পিতভাবে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত স্বাধিকার আন্দোলনে রাজনৈতিক দল-মতের সঙ্গে দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের একটা সুস্পষ্ট যৌথ কর্মপ্রয়াস ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই কর্মতৎপরতা আরো জোরদার হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে কুড়িটিরও বেশি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিলো। প্রেসে ছেপে, সাইক্লোষ্টাইল করে, এমন কি হাতে লিখে সেগুলো বিতরণ করা হতো। প্রকাশের ভঙ্গি যা-ই হোক, সবগুলোরই আদর্শ ও উদ্দেশ্য ছিলো অভিন্ন; শত্রুর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করা।

সত্যিকার অর্থেই এ সময়ের সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক এবং চারুশিল্পের কারিগরগণ নতুন উত্তেজনায় ঝলছে ওঠেন। পাকিস্তানিদের অত্যাচারের প্রতিবাদে পাকিস্তান সরকারের খেতাব বর্জন করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, শিক্ষাবিদ ইব্রাহীম খাঁ, কবি আহসান হাবীব, কথাশিল্পী সরদার জয়েনউদ্দিন, সংগীতজ্ঞ আবদুল আহাদ প্রমুখ। তাঁরা নিজেরা যতোটা ঝলসে উঠেছেন তার চেয়েও বেশি উত্তেজিত ও অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিকদের। এখানেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনেক বড় সফলতা।

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে অবদান রেখেছে বাঙালী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, কবিদের কঠোর পরিশ্রম, নিরলস প্রচেষ্টা এবং অকৃত্রিম দেশপ্রেম। কবিতার চরণে চরণে বারুদ ঝলসে উঠেছে। একেকটা পঙক্তি হয়ে উঠেছে স্বপ্ন নির্মাণের কোষমুক্ত তলোয়ার। কবি-সাহিত্যিগণ ছড়িয়ে দিয়েছেন কবিতা, গান, নাটক, রম্যগল্পসহ নানা ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ। এই রসদে মুক্তিবাহিনীর সদস্য এবং বাংলার সাধারণ মুক্তিকামী মানুষ যেমন মুক্তির আলোর নেশায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন তেমনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। তারা নানাভাবে ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন সাহসী কলম। আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাস’ বাজেয়াপ্ত করা হয়। সেইসাথে বাজেয়াপ্ত করা হয় কামরুদ্দীন আহমদের ‘দ্য সোশ্যাল হিস্ট্রি অব ইস্ট পাকিস্তান’ বইটি। দেশের ভেতরে শ্বাসরুদ্ধকর ভয়ংকর পরিবেশে বিচ্ছিন্ন ও মৃত্যুতাড়িতভাবে দিন কাটাতে হয়েছে অগণিত শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীকে। তবুও তারা ৃশিল্পের পথে লড়ার প্রত্যয় হারাননি। সৈয়দ আলী আহসান, কল্যাণ মিত্র, সিকান্দার আবু জাফরের মতো শক্তিশালী সাহিত্যিকরাও বেতারের শব্দাস্ত্রে নবতর বারুদ সংযোজন করেন। অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক মুক্তিযুদ্ধের জন্য নিজেদের কলমকে নিবেদিত করে রাখেন। তাঁদের নিবন্ধ, গল্প, নাটক, কবিতা এবং গান মানুষকে নতুন স্বপ্নে দোলায়িত করেছে। অনুপ্রাণিত করেছে সাধারণ মানুষকে। ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে পাকিস্তানী শাসকের অন্তর। স্বাদীন বাংলাদেশের প্রতিটি পথচলায় সে সকল সাহিত্য আমাদের অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।

সঙ্গীতের তরঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ

একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে গণমানুষকে জাগিয়ে তুলতে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করে সঙ্গীত। বিশেষত, গণসঙ্গীতের ভাব-ভাষা এবং সুরের ঝংকার মানুষের হৃদয় উঠোণে অন্যরকম একর অনুরণন তৈরি করে। সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে মুক্তিপাগল মানুষ। ৮ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বেতার-টেলিভিশনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ এর হাতে। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে রাতে ডিআইটিতে অবস্থিত টেলিভিশন কেন্দ্র হতে পাকিস্তানের পতাকা দেখানো থেকে বিরত থেকে দেশপ্রেম ও উদ্দীপনামূলক গান পরিবেশন করা হয়। বিক্ষুব্ধ শিল্পী-সমাজ টিএসসি, পল্টন, তোপখানা রোড, বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণ, বাহাদুর শাহ পার্ক, সদরঘাট টার্মিনাল, হাজারীবাগ, শান্তিনগর, মগবাজারসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গণসংগীত, গণনাট্য অনুষ্ঠান, কবিতা পাঠের আসর, ছড়া পাঠের আসর ও পথসভার আয়োজন চলে। চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সংগীত পরিচালকগণ যুক্ত বিবৃতিতে ঘোষণা করেন যে, পূর্ব বাংলার ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চলচ্চিত্র সমাজ জনতার সংগ্রামের সঙ্গে থাকবে।

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কুশলীরা কালুরঘাটে একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেন। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা এবং নানা ধরনের নির্দেশনা, সংবাদ প্রচার সাময়িককালের জন্য প্রচার হলেও পরে তারা সীমান্ত দিয়ে অন্য একটি অবস্থানে চলে যান। খুব দ্রুতই তারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেন। এই বেতার কেন্দ্রে দেশের সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রশিল্পী এবং অন্য শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ পরিবেশনা, সম্পাদকীয় মন্তব্য বিভিন্ন সেক্টরের যুদ্ধের খবর, তাৎক্ষণিকভাবে রচিত নাটক, সংগীত, শেখ মুজিবুর রহমানের রেকর্ড করা ভাষণ, নেতাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের এবং দেশবাসীকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করতে থাকে। দেশের অভ্যন্তরে আতঙ্কিত জনগণের কাছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটা স্বস্তির জায়গায় পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধের তাৎক্ষণিক সংবাদ মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে প্রবলভাবে সাহায্য করে। এ সময়ে কোনো কোনো মুক্ত এলাকায় গানের অনুষ্ঠান এবং যাত্রাপালার অভিনয়ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে স্বাধীনতার চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে।

খুব আয়েশী অবস্থায় সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয়নি বাংলাদেশে। ২৪ মে বেতারে অনুষ্ঠান প্রচারের প্রস্তুতি শুরু হয়। শুরু হয়েছিল শুধু একটি রেকর্ডিং মেশিন এবং একটি মাইক্রোফোন দিয়ে। সে দিন রাত চারটা পর্যন্ত খেটে তিনটি অধিবেশনের জন্য অনুষ্ঠান সূচী তৈরী করা হয়। তারপর ২৫ মে মুজিবনগর থেকে বাঙালীদের এবং বিশ্ববাসীর জন্য ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের’ অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়।

অনুষ্ঠামালাতেও ছিলো বৈচিত্রের ছাপ। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান ‘অগ্নিশিখা, একটি জাতীয়তাবাদী সাহিত্য আসর ‘রক্তস্বাক্ষর, ‘বজ্রকণ্ঠ, বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠান ‘দর্পণ, জাতীয়তাবাদী এবং বিপ্লবী সংগীতানুষ্ঠান ‘জাগরণী, সংগীতানুষ্ঠান ‘ঐকতান, পাকসেনাদের মনোবল ভাঙার জন্য তাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা ব্যঙ্গ বিদ্রুপাত্মক অনুষ্ঠান ‘চরম পত্র’সহ নিয়মিত ইংরেজি খবর, বাংলা খবর, বিশ্ব জনমত প্রভৃতি অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল ‘চরমপত্র’। এই অনুষ্ঠানে পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে ব্যঙ্গ করে হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়। ‘জল্লাদের দরবার’ অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খানকে ‘কেল্লা ফতে খান’ হিসেবে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। পবিত্র কোরান তেলওয়াতের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন সকালের অনুষ্ঠান শুরু হতো। হিন্দুদের জন্য গীতা এবং বৌদ্ধদের জন্য ত্রিপিটক পাঠের ব্যবস্থা হয়েছিলো সপ্তাহে দুবার। সমকালের অনবদ্য সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ কিংবা ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘বিজয় নিশান উড়ছে অই’-এর মতো কালোত্তীর্ণ গান মানুষকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। সার্থক অনুষ্ঠান প্রচার ও প্রযোজনা করার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তৎকালীন কলাকুশলীগণ।

ব্যক্তিপর্যায় থেকে সাংগঠনিক পর্যায়েও চলে মুক্তিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলোতে ট্রাকে করে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের গান শুনিয়ে তারা মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের মানুষকে উদ্দীপ্ত করত। ভারতের ত্রিপুরার আগরতলাতে আশ্রয় নেয়া শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সম্মিলিত প্রয়াসে ১৯৭১ সালের ৩ জুন ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংস্থা’। মুক্তিযোদ্ধা শিবির, শরণার্থী শিবির, যুব শিবিরসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে মুক্তির গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

চারুকারু শিল্প ও মুক্তিসংগ্রাম

চিত্রশিল্পীরাও রংতুলি নিয়ে নেমে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তাঁদের তুলির সঠিক ব্যবহার করেছিলেন সময়ের সাথে সাথে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মতো ধারাবাহিক আন্দোলনে যেমন ভূমিকা রেখেছেন তেমনি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন তাঁরা। চিত্রশিল্পিরা তাদের তুলির আঁচড়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানী শাসকের মসনদ। শিল্পিদের ফেস্টুন, কার্টুন, ব্যানার, পোস্টার, ব্যঙ্গচিত্রগুলো যেন বন্দুক, রাইফেল, গ্রেনেড, কামান, বোমার মতো বিস্ফোরক হয়ে হাজির হয়েছিল পাকিস্তানীদের সামনে। তুলির মাধ্যমে তারা মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন।

শিল্পীদের অভিনব প্রচারণা মুক্তিযুদ্ধকে আন্দোলিত করে তোলে। ‘স্বা ধী ন তা’- এই ৪টি অক্ষরকে বুকে নিয়ে চারুশিল্পী সংসদের উদ্যোগে রাজপথে শিল্পীদের মিছিল মুক্তির সংগ্রামে মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত চারু ও কারুশিল্প মহাবিদ্যালয়ের এক সভায় শিল্পীরা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আন্দোলনমুখী পোস্টার ফেস্টুন সহকারে মিছিলের আয়োজন করা হয়। পটুয়া কামরুল হাসানের ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরো রক্ত দেবো, ‘রক্তের ঋণ রক্তে শুধবো, দেশকে এবার মুক্ত করবো’ ‘ঘরে ঘরে দুর্গ ঘরে তোলো’, ‘মুক্তিবাহিনী আপনার পাশেই আছে’, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ‘শরণার্থী’, পটুয়া কামরুল হাসানের ‘মুক্তিযোদ্ধা রমণী’ শীর্ষক চিত্রকর্ম, আমিনুল ইসলামের ‘গণহত্যা’ শীর্ষক তৈলচিত্র, কাইয়ুম চৌধুরীর ‘গণহত্যা-৭১, শিল্পকর্মগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবেরই অংশ।

‘শরণার্থী’ নামের ছবিতে দেখা যায় ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্তের উদ্দেশ্যে চলে যাওয়ার চিত্র। মুক্তিযুদ্ধ চলকালীন পাক হানাদার বাহিনীর অমানুষিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকা-ের জীবন্ত চিত্র, বাংলার মানুষের অসহায়ত্বের নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে রং-তুলির মাধ্যমে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামক স্কেচে ফুটে উঠেছে রাইফেল হাতে চোখে মুখে বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যয়ে ক্ষিপ্র পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে আসার চিত্র। বিজয়ের প্রেরণাদানকারী এই ছবিতে ঘৃণা ও শোকের প্রতীক হিসেবে তিনি মোটা ও কালো ব্রাশে আঁকেন। এই পোস্টার চিত্রগুলো পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্রোহের উদ্রেক বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তর থেকেও এগুলো প্রচার করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করার জন্য ১৯৭১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে বাংলাদেশের ১৭ জন শিল্পীর ৬৬টি শিল্পকর্মের একটি ঐতিহাসিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। পরবর্তীতে দিল্লিতেও এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা, নারী নির্যাতন, সাধারণ মানুষের ভীতি প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এই ছবিগুলোতে।

পরিশেষে বলা যায়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। দেশ ও জনগণের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে ধারণ করে ভবিষ্যতের পথরেখা তৈরিতে কাজ করেন শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক-বাহকগণ। শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধেই নয়, দেশের যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের শিল্পীসমাজ। শিল্পী হিসেবে বিবেকের কাছে শিল্পের দায়ে দেশের জন্য কাজ করে যান তাঁরা। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যে কোন আন্দোলন সংগ্রামেও শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবেও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে ঝলসে ওঠেন এ অঙ্গনের যোদ্ধারা। আবর্তিত সময়ের চাকায় এ ধারা কখনো ব্যহত হবে না।

জনতার কল্যাণেই হাসিমুখে সবকিছু বিসর্জন দেয়ার নমুনা স্থাপন করে গেছেন আমাদের পূর্বপুরুষ। অতীতকে সামনে রেখে বর্তমানের প্রয়োজনে বিশ্বাসী চেতনায় আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে পূর্বপুরুষের পথযাত্রায়। গুরুত্ব বাড়াতে হবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের। তৈরি করতে হবে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। লিখতে হবে বারুদ মাখা কবিতা। নির্মাণ করতে হবে বিশ্বাসী ধারায় বিপ্লবী গান। আঁকতে হবে বিদ্রোহী চেতনার বিপ্লবী পোস্টার। নির্যাতিত নিপীড়িত মনবতার পাশে দাঁড়াতে হবে রাজনৈতিক আন্দোলনের অগ্রভাগে। তবেই আমাদের লাল-সবুজের বাংলাদেশে স্বপ্নের কল্যাণময় রাশেদার সমাজ প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।