ড. আশরাফ পিন্টু

আমার লেখালেখির শুরু হয় তৃতীয় শ্রেণি থেকে (১৯৭৮)। তবে ওই সময়ে আমার কোনো লেখা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নি। লেখার শুরুটা হয়েছিল ছড়া দিয়ে; কিন্তু ১৯৮৪ সালে খুলনা থেকে প্রকাশিত শিশু-কিশোর মাসিক ‘‘সপ্তডিঙা’’ পত্রিকায় যে লেখাটা প্রকাশ পায় সেটি ছিল একটি কিশোর গল্প। আমার জানা মতে, প্রায় সব লেখকই প্রথম জীবনে ছড়া কবিতা দিয়ে লেখা শুরু করেন। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে আমি ছড়া ও গল্পÑ দুটোই লিখতাম।

আমার ছড়া লেখা শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে নব্বই দশক পর্যন্ত। লিখতে লিখতে প্রায় শ’খানেক ছড়া জমা হয়। তখণ বই প্রকাশের ইচ্ছা জাগে। কিন্তু বই প্রকাশ করবে কে? নতুন লেখকদের বই প্রকাশ করা খুবই দুরহ ব্যাপার। একদিন একটি চিঠি পেলাম (১৯৮৯)। চিঠির প্রেরক আহমদ সাকী। চিঠিতে লেখা আছে : নবীন-প্রবীণ লেখকদের ছড়া নিয়ে ‘‘বাংলাদেশের বাছাই ছড়া’’ নামে একটি বই প্রকাশিত হবে। আপনি তিনটি ছড়া পাঠাবেন। ভালো হলে ছাপা হবে।

সাকী ভাইয়ের কথামতো তিনটি ছড়া পাঠালাম। উক্ত বইতে (বর্তমানে এরকম গ্রন্থকে যৌথগ্রন্থ বলে) ‘‘কিপটে মামা’’ শিরোনামে আমার একটি ছড়া ছাপা হয়। বইটি ১৯৯০ সালে অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৯১ সালে রাশেদ হোসেন সম্পাদিত ‘‘বাংলাদেশের সুনির্বাচিত ছড়া’’ গ্রন্থে আমার একটি ছড়া ছাপা হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে ‘‘বাংলাদেশের কিশোর কবিতা’’ (১৯৯২), যাযাবর মিন্টু সম্পাদিত ‘‘ভাষা- আন্দোলনের ছড়া কবিতা’’ (১৯৯৫), মুক্তিযুদ্ধের ছড়া’’ (১৯৯৪), ‘‘স্বাধীনতার বাছাই ছড়া’’ (১৯৯৫) প্রভৃতি যৌথগ্রন্থে ছড়া ছাপা হতে থাকে।

এভাবে বিভিন্ন যৌথগ্রন্থে ছড়া ছাপা হবার পর পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশ করার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু বই প্রকাশ করবে কে? বর্তমানে অনেক তরুণ লেখক নিজটাকা ব্যয় করে প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু আমাদের সময়ে (নব্বই দশকে) সেটা সম্ভব ছিল না। থাকলেও ছাত্রজীবনে টাকা কোথায় পাবো? তবে আমার সৌভাগ্য যে, আমার প্রথম বই বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। কীভাবে হলোÑ সে কথাই এখন বলছি।

আমি তখন (১৯৯৬) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ি। হঠাৎ একদিন একটি চিঠি পেলাম। চিঠিটি পাবনা থেকে পাঠিয়েছে বন্ধু ইসলাম হোসেন ইন্দা। খুলে দেখি চিঠির সঙ্গে বাংলা একাডেমির একটি ফরম।

ইন্দা লিখেছে : ‘‘বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্পে ৪০ জন তরুণ লেখক ভর্তি করবে। যোগ্যতা স্নাতক পাস। তুমি প্রেরিত ফরম পূরণ করে বাংলা একাডেমি বরাবর পাঠাবে।’’ উল্লেখ্য, ইন্দা ওই প্রকল্পের প্রথম ব্যাচের তরুণ লেখক ছিল।

ওর চিঠির কথামতো আমি আবেদন করলাম। যখন ইন্টারভিউ কার্ড হাতে এলো তখন আমার এমএ ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। আমার আর তরুণ লেখক প্রকল্পে ইন্টারভিউ দেওয়া হলো না। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। লেখক হবার স্বপ্ন অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল।

এমএ পরীক্ষা শেষ করে পাবনা (বাসায়) এসেছি। ক দিন পর ঢাকা থেকে একটি চিঠি এলো। চিঠিটি লিখেছেন আমার ছোট দুলাভাই। দুলাভাই বিআরটিসিতে চাকুরি করতেন। থাকতেন দক্ষিণ পীরের বাগ। তার বাসার পাশে থাকতেন আনিসুর রহমান নামে বাংলা একাডেমির একজন উপপরিচালক। তিনি দুলাভাইকে বলেছেন, আপনার শ্যালক তরুণ লেখক প্রকল্পে দরখাস্ত করেছিল না? ওই ইন্টারভিউটি কারণবশত স্থগিত হয়ে গিয়ে ছিল। জানুয়ারির মাঝামাঝি (তারিখটি মনে নেই) স্থগিতকৃত পরীক্ষাটি হবে। যা হোক, দুলাভাই আমাকে নির্ধারিত তারিখে পরীক্ষা অংশগ্রহণের কথা চিঠিতে লিখেছেন।

আমি নির্ধারিত তারিখে বাংলা একাডেমিতে গিয়ে লিখিত পরীক্ষা দেই। আল্লাহর অশেষ রহমতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। এরপর মৌখিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হই। উল্লেখ্য, আমাদের ভাইভা বোর্ডে পরীক্ষক ছিলেন কবি রফিক আজাদ ও কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার।

আমাদের তরুণ লেখক প্রকল্পের ব্যাচটি ছিল প্রথম পর্যায়ের শেষ (চতুর্থ) ব্যাচ। মেয়াদকাল ছিল ৬ মাস (জানু-জুন ১৯৯৭))। আমরা ৪০ জন টগবগে তরুণ লেখক ভর্তি হলাম। সব বন্ধুই লেখক। কেউ ছড়া কবিতা, কেউ গল্প-উপন্যাস, কেউ বা নাটক লেখে। আমাদের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী। ক্লাস নিয়েছেন দেশবরেণ্য সব কবি-সাহিত্যিক। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন : কবি শামসুর রাহমান (তিনি ওই সময়ে বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান ছিলেন), নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমদ, কবি রফিক আজাদ, কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার, কবীর চেীধুরী প্রমুখ। কিছু কর্মকর্তার বিরোধিতার কারণে কবি আল মাহমুদ ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ক্লাস নিতে পারেন নি। তারপরেও আমরা অনেকেই তাদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেছি।

ক্লাস শেষের দিকে। আমাদের বই প্রকাশের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের ৪০ জন লেখকের পাণ্ডলিপি প্রস্তুতের জন্য ৪০টি কম্পিউটার ছিল। জীবনে প্রথম কম্পিউটার চালানো শিখি এই তরুণ লেখক প্রকল্পে এসে এবং প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিজহাতে কম্পোজ করি। একদিন ক্লাস শেষে প্রকল্প পরিচালক আসাদ চৌধুরী আমাকে ডেকে বললেন, ‘‘পিন্টু, তোমার কবিতার চেয়ে ছড়া লেখা ভালো হয়। তুমি ছড়ার পাণ্ডুলিপি রেডি করো।’’

উল্লেখ্য, আমরা সপ্তাহে একদিন স্বরচিত ছড়া, কবিতা, গল্প পাঠ করে ক্লাসের সবাইকে শোনাতাম। কয়েক দিনের মধ্যেই বিষয়ভিত্তিক লেখক বাছাই হয়ে গেল। সবচেয়ে কমসংখ্যক পাণ্ডুলিপি জমা পড়লÑ ছড়া, উপন্যাস ও নাটকে। ছড়ায় তিনটি, উপন্যাসে দুটি ও নাটকে চারটি। বাদবাকি সবাই কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধে। আমি শ’খানেক ছড়ার মধ্যে ৫১টি ছড়া বাছাই করে পাণ্ডুলিপি রেডি করলাম। বইয়ের নাম দিলামÑ ‘‘হিগিন বিগিন’’। ব্যতিক্রমধর্মী এ নামটি অনেকেই পছন্দ করল। বইটি প্রকাশিত হলো ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। এটি আমার প্রথম বই। বই হাতে পাবার পর কী যে ভালোলাগা! বাংলা একাডেমি আমাকে ৫০০খানা বই লেখক কপি দিলো। অধিকাংশ বই-ই উপহার দিয়ে শেষ করেছিলাম (প্রথম বই বলে কথা!)। তবে ১৯৯৮ সালে অমর একুশে বইমেলায় আমরা (তরুণ লেখকরা) স্টল নিয়েছিলাম। সেখানে আমার বইও ছিল। কিছু কপি বিক্রিও হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা থেকে চলে আসার কারণে সেই বই বিক্রির টাকা আর পাওয়া যায় নি।

ওই সময়ে আমি ছড়াকার হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলাম। এখন আমাকে গবেষক হিসেবেই বেশি চেনে। কেউ কেউ অণুগল্পকার ও সায়েন্সফিকশন লেখক হিসেবেও জানে। বর্তমানে আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫০টি। এরমধ্যে ২০টি আঞ্চলিকৈ ইতিহাস ও গবেষণাধর্মী, ১১টি শিশুসাহিত্য, ৯টি অণুগল্প, বাদবাকি বিবিধ বিষয়ক। কিন্তু আমার প্রথম বই ‘‘হিগিন বিগিন’’-এর প্রতি এখনো অন্যরকম ভালোবাসা রয়ে গেছে।