খোরশেদ মুকুল
কবিতা প্রত্যেকটা যুগেই তার কাল ও সমাজকে ধারণ করে; কখনও ব্যক্তির অন্তর্বেদনায়, কখনও সমষ্টির দীর্ঘশ্বাসে আবার কখনও বিদ্রোহের দ্যুতিময় উচ্চারণে। সেই ধারাবাহিকতায় আগ্রাসনবিরোধী কবিতা শুধু নান্দনিক প্রকাশ নয়, বরং সময়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক নৈতিক অবস্থান। বর্তমান বিশ্বেযুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের কবিতাগুলো হয়ে উঠে প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের চিহ্ন। কবিতিকার এই সংখ্যা তাই কেবল সাহিত্যিক উদ্যোগ নয়; এটি একটি মানবিক দলিল, যেখানে রক্তাক্ত বাস্তবতা, বঞ্চিত মানুষের আর্তি এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস একসূত্রে গাঁথা। এখানে কবিরা ব্যক্তিগত অনুভবকে ছাড়িয়ে সামষ্টিক চেতনার মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন, যা পাঠককে শুধু স্পর্শই করে না, প্রশ্ন করতেও বাধ্য করে।
এই সংখ্যায় স্থান পেয়েছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কবিরা, যেন বিশ্বের কণ্ঠস্বর একত্রিত হয়েছে এক অভিন্ন মানবিক আর্তনাদে। সাদী শিরাজি থেকে মাহমুদ দারবিশ, মাইয়্যু আলি থেকে মীনা কান্দাসামি। আন্তর্জাতিক কবিতাকে বাংলায় রূপান্তরিত করে সম্পাদক দেখিয়েছেন যে, মানবিক যন্ত্রণার ভাষা কোনো সীমানা মানে না। একই সঙ্গে আল মাহমুদ, হেলাল হাফিজ, মাহবুব হাসান, মনজু রহমান, সাজ্জাদ বিপ্লব, খৈয়াম কাদের, সীমান্ত শরিফ, এ কে আজাদ, মামুন সুলতান, কামরুল আলম, নাছির বিন ইব্রাহিম, শাদমান শাহিদ, প্রতীক ওমর, সেলিম এমরাজ, আখতার ইবনে জওহর, হাসান রুহুল, খোরশেদ মুকুল, আজাদ আশরাফ, হিমেল রিফাত, বাপ্পা আজিজুল প্রমুখ বাংলাদেশি কবিদের কবিতা এই সংখ্যাকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা ও গভীরতা। স্মরণ ও নিবেদন বিভাগটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ বিরোধী কণ্ঠস্বর’ কবি সীমান্ত শরিফের প্রতি।
কবিতিকার আগ্রাসন বিরোধী ভাঁজপত্র’র এই কবিতাগুলোকে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে প্রথমেই যা চোখে পড়ে তা হলো ভাষার সরাসরিতা ও প্রতিমার তীব্রতার সহাবস্থান। অধিকাংশ কবিতাই বিমূর্ততার আশ্রয় না নিয়ে বরং কংক্রিট চিত্রকল্পের মাধ্যমে যুদ্ধের ক্ষত, দখলের যন্ত্রণা এবং মানবিক বিপর্যয়কে সরাসরি পাঠকের বুকে এসে ঠেকায়। এটি একটি সচেতন শিল্পকৌশল; যখন বাস্তবতা নিজেই এতটা অসহনীয়, তখন রূপকের আবরণ অনেক সময় সত্যকে ঢেকে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে। শব্দনির্বাচনের দিক থেকে এই সংখ্যার কবিতাগুলো মূলত দুটি স্বতন্ত্র স্তরে বিন্যস্ত হয়ে একটি শক্তিশালী দ্রোহের ভাষা তৈরি করেছে। প্রথম স্তরে, কবিরা লাশ, রক্ত, বোমা, ক্ষুধা এবং মাতৃভূমির মতো অত্যন্ত সাধারণ ও প্রচলিত শব্দগুলোকে ব্যবহার করেছেন, যা পাঠকদের কাছে অতি পরিচিত হলেও এই সংকলনে তা নতুন অর্থের স্তর উন্মোচন করে। উদাহরণস্বরূপ, এখানে লাশ কেবল কোনো মৃতদেহ নয়, বরং তা বিবেকের লাশ হিসেবে ভূমধ্যসাগরে ভেসে বেড়ায়, যা আধুনিক সভ্যতার চরম নৈতিক অবক্ষয় ও নিস্পৃহতাকে নির্দেশ করে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে কিছু অপ্রচলিত, কারিগরি বা ভিন্নধর্মী শব্দের সার্থক প্রয়োগ যা পাঠককে আচমকা থামিয়ে দেয়। যেমনÑ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংকটকে শরীরের অভ্যন্তরীণ সংকটের সাথে তুলনা করতে অণুচক্রিকা বা ইন্টারনাল ব্লিডিং-এর মতো চিকিৎসা বিজ্ঞানের শব্দ এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা বোঝাতে মুদ্রাস্ফীতি শব্দটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া, বৈশ্বিক অপশক্তি, দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বা গোলকধাঁধা বোঝাতে দাজ্জাল, আসহাবে কাহাফ, লেবিরিন্থ’ কিংবা মমি-র মতো শব্দগুলো কবিতার শরীরে এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের ছোঁয়া দিয়েছে।
সংকলনটি শক্তিশালী রূপক ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের এক বিভীষিকাময় চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। এখানে দখলদার বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে হায়না শকুন বা অসুর’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যার বিপরীতে শান্তির প্রতীক হিসেবে এসেছে সাদা কবুতর’ বা শান্তির কপোত। বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়কে বোঝাতে কবিরা আপসের চোরাবালি’ কিংবাবিবেকের লাশ-এর মতো মর্মস্পর্শী রূপক ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলতে রক্তাক্ত শার্ট বা ‘বোমা-বিদ্ধ শিশুর মতো সরাসরি চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে কবি গাজার বোমার আঘাত নিজের গায়ে অনুভব করার মাধ্যমে নিপীড়িত মানবতার প্রতি এক গভীর ও অনন্য শৈল্পিক সংহতি প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া ভাষা মূলত দ্রোহাত্মক ও তীক্ষè, যেখানে জায়নবাদ, ফ্যাসিবাদ বা মুদ্রাস্ফীতির মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শব্দগুলো সরাসরি প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সুন্দরের সাথে ধ্বংসের বৈপরীত্য বা আইরনি এই সংখ্যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য; যেখানে প্রিয়তমার খোঁপার সাদা গোলাপ শহীদের রক্তে লাল হয়ে ওঠে অথবা কবি প্রকৃতির সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়েও বারবার গাজা, রাখাইন বা কারগিলের বীভৎসতার সামনে থমকে যান। পাশাপাশি, হেলাল হাফিজের কবিতায় নিউট্রন বোমা বোঝা অশ্লীল সভ্যতার তীব্র ব্যঙ্গ এবং সাদী শিরাজীর অনুবাদে মানবজাতিকে একই শরীরের অঙ্গ হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে সংকলনটি কেবল অলংকারের জন্য অলংকার থাকেনি, বরং এটি এক বিশ্বজনীন মানবিক আর্তনাদ ও শৈল্পিক প্রতিরোধের দলিলে পরিণত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এই সংখ্যার কবিতাগুলোতে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কাব্যিক সৌন্দর্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি নিরন্তর প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আবেগ কাব্যিক সংযমকে ছাপিয়ে গেলেও তা এই সংখ্যার আগ্রাসন বিরোধী আদর্শিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাসঙ্গিক। সম্পাদক বাপ্পা আজিজুলের সুযোগ্য তত্ত্বাবধানে কবিতিকা পাঠকের সামনে একটি অনন্য কাব্যিক দলিল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে বলে আশা করি। পরিশেষে, মাহমুদ দারবিশের সেই অমর সংলাপটিই মনে পড়েÑ যুদ্ধ তখনই শেষ হবে যখন মানুষের সাথে মানুষের দেখা হবে। মানুষের পরস্পরকে চেনার এই মানবিক পথে শান্তির বার্তা ছড়াতে কবিতার চেয়ে শক্তিশালী কোনো হাতিয়ার নেই।