নজরুল রাসেল

ঘড়ি দেখলো তানভীরÑ রাত সাড়ে বারোটা। প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। কেবল কিছু কুলি ব্যস্ত ভঙ্গিতে মাল তুলছে, আর টুকটাক চায়ের দোকান থেকে চামচ নাড়ানোর শব্দ আসছে। এক জায়গায় কিছু ছোটছোট ছেলে-মেয়েদের জটলা দেখা গেল। মনে হয় নিজেদের মধ্যে কোন কিছু ভাগবাটোয়ারা করছে।

তানভীরের হাতে ভারী একটা ব্যাগ। আজ তার শহর ছাড়ার দিন। গত কয়েক বছর ধরে চাকরির খোঁজে এ শহরে পড়ে থেকে কিছুই হয়নি। চিলেকোঠার গরম আর ব্যর্থতার চাপ মিলিয়ে বুক ভরে উঠেছে একরাশ ক্লান্তিতে। গ্রাম থেকে বাবা কতোবার ফোন করে বলেছেন, “আর কষ্ট করো না, হবে না। এবার বাড়ি চলে আসো।” ট্রেন ছাড়ার কথা বারোটায়, এখন বারোটা চল্লিশ বাজে। আর কতোক্ষণ লাগবে কে জানে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক, স্টেশনের এক কোনে বসে আছে। ছেঁড়া কম্বল গায়ে, পাশে একটা পুটলি রাখা। বৃদ্ধ গভীর মনোযোগে হাতের পয়সা গুনছে। তার চোখে তৃপ্তির ছায়া। তানভীরের মনে হলো, সে তার হাতের পয়সাগুলো কয়েকবার করে গুনছে।

পকেটে হাত দিলো তানভীর, ক্ষিদে লেগেছে। মানিব্যাগে এখনো দুইশ’ আশি টাকা আছে। ভোরে তাকে ট্রেন থেকে নেমে বাস ধরতে হবে। সেখানে খরচ হবে একশ’ পঞ্চাশ টাকা। তবুও সে দু’টি ‘হানি কম্ব’ ব্রেড কিনলো; একটি ব্রেড এগিয়ে ধরলো সেই বৃদ্ধের সামনে। বৃদ্ধ চুপ করে একবার তাকালো, তারপর হতে নিয়ে মৃদু হাসলো।

“আপনে কই যাইবেন?” বৃদ্ধের কণ্ঠ ক্ষীণ, কিন্তু উচ্চারণ স্পষ্ট।

“গ্রামে ফিরে যাচ্ছি। এই শহরে আর কিছু হলো না।” বলেই মাথা নিচু করে ব্রেডের প্যাকেট ছিঁড়তে শুরু করলো তানভীর।

“সবার হয় না বাপজান। যাগোর হয় না, তাগোর কপাল খারাপ। তয় যাগোর হয়, তাগোরও কপাল খারাপ।” বলেই বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। একটু থেমে বললো, “হেই যে একদিন বাড়ি ছাড়লাম, আর কুনদিন আমার বাড়ি ফিরা হয় নাই!”

“আপনার ছেলে-মেয়ে নাই?” খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো তানভীর।

“আছিল, অহন নাই।” বলেই তানভীরের দেওয়া রুটিটা হাতে নিল বৃদ্ধ।

তানভীর নিশ্চুপ বৃদ্ধের খাওয়া দেখতে লাগলো। বৃদ্ধের চোখে-মুখে তৃপ্তির ছায়া।

হঠাৎ হুইসেল বাজলো। ট্রেন এসে পড়েছে। এটাই শেষ ট্রেন। তানভীর তার ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল। ট্রেনের দিকে কয়েক কদম যাওয়ার পর পকেটে হাত দিল, টিকেট থেকে বগি নম্বর দেখার জন্য। হঠাৎ তার হাতে শক্ত কী যেন লাগলো! বের করার পর দেখা গেল একটা চাবি, তার সেই গরম লাগা চিলেকোঠার চাবি। আসার সময় বাড়ির মালিককে দিয়ে আসতে ভুলে গেছে।

সে থমকে দাঁড়ালো। বুকের ভেতর এক অজানা টান। মনে হলো, সেই চার তলার চিলেকোঠার মায়া সে এখনো কাটাতে পারেনি।

ফিরে তাকাল তানভীর। সেই বৃদ্ধকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না, যায়গাটা শূন্য। শুধু তার দেওয়া রুটির প্যাকেটটা পড়ে আছে, মাঝে মাঝে বাতাসে নড়ছে। দূর থেকে চায়ের দোকানের চামচ নাড়ানোর শব্দ এখনো কানে আসছে। আবার হুইসেল বাজলো, ট্রেন ছেড়ে দিবে। দু’জন যাত্রী তানভীরের গা ঘেঁষে ট্রেনে উঠে গেল। শুধু সে দাঁড়িয়ে রইলো প্ল্যাটফর্মে।

হঠাৎ তার মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা ব্যাগটা আলগা হয়ে গেল। বৃদ্ধ যেদিকে বসে ছিল, সেদিকে তাকিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল সে। কানে বাজলো বৃদ্ধের সেই কথাটা, “হেই যে একদিন বাড়ি ছাড়লাম, আর কুনদিন আমার বাড়ি ফিরা হয় নাই!”