নাজিব ওয়াদুদ

আমার গল্পচর্চার শুরু ১৯৮০ সালে। কিন্তু ১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত আমার সাহিত্যের লেখা এবং পড়া দুটোই সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। ১৯৮৮ সালে আবার লিখতে শুরু করি। নব্বই দশকের মাঝামাঝির দিকে এসে শুভানুধ্যায়ীরা বই প্রকাশের জন্যে পীড়াপীড়ি শুরু করলেন। সমস্যা হলো, প্রকাশক তো দূরের কথা কোনও সম্পাদকের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ ছিল না। ডাকে লেখা পাঠাতাম। ছাপা হতো। ব্যস। ওই নিয়েই তৃপ্ত ছিলাম। যাই হোক, ১৯৯৪ সালে একজন শুভানুধ্যায়ী আমাকে ঢাকায় পাঠালেন। প্রকাশক মহোদয় পাণ্ডুলিপিটা গ্রহণ করলেন যথেষ্ট আগ্রহ সহকারে। প্রায় এক বছর ধরে বেশ কয়েকবার খোঁজ নিয়েছি। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়ে এসেছিলাম। এর প্রায় বছরখানিক পরে কাকতালীয়ভাবে পরিচয় ঘটল আরেক প্রকাশকের সঙ্গে। তিনি নিজেই আগ্রহ করে আমার কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি চেয়ে নিলেন। বলা বাহুল্য, আমি নিজে যেঁচে কখনও সে পাণ্ডুলিপির খবর নিতে যাইনি, উনিও কিছু বলেননি।

১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্র ‘স্কয়ার’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ওদের অনুরোধে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দিলাম। দুটো গল্পের সমন্বয়ে বইটার নামকরণ করলাম ‘কাক ও কারফিউ’। একটা ছাত্রসংঘর্ষের সময় সেটা ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হলো। ওদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। পাণ্ডুলিপিও গেল হারিয়ে। ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে হঠাৎ একদিন ওই তিন রত্নের একজন মনিরুজ্জামান সাগর আমার ডেরায় এসে হাজির। ওদের একটা কম্পিউটার ফেরত পাওয়া গেছে, সেটার হার্ডডিস্ক থেকে সৌভাগ্যক্রমে আমার কম্পোজ করা পাণ্ডুলিপিটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সে এখন বইটা করতে চায়। প্রচ্ছদ এঁকে দিলেন মোমিনউদ্দীন খালেদ। অলঙ্করণ করল রাজশাহীর শিল্পী আব্দুস সাত্তার। প্রকাশনার কিছুই জানতাম না আমরা। তবে, মফঃস্বল-মফঃস্বল গন্ধ লেগে থাকলেও, রুচিশীল হয়েছিল বইটা।

পাঁচশ’ কপি বই ছাপা হয়েছিল। উদার-হৃদয় প্রকাশক আমাকে দিয়েছিল দুইশ’ কপি। বাকি বই ঢাকার এক পরিবেশককে দিয়েছিল। আমি তিরিশ-চল্লিশ কপি সৌজন্য উপহার দিয়েছি। বাকি বই বিভিন্ন জায়গায় বিক্রির জন্যে দিয়েছিলাম। এখন এই বইটির একটি মাত্র কপি আমার কাছে আছে। তবে সুখবর হলো, ২০১৩ সালের একুশে বইমেলায় এই বইটি পুনর্মুদ্রণ করে ঢাকার মহাকাল প্রকাশনী।

অনেকেই বলেন, এই প্রথম বইতেই ছোটগল্পকার হিসেবে আমার প্রতিশ্রুতি ও সাফল্যের স্বাক্ষর প্রতিবিম্বিত হয়েছিল।

এই বই নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেছেন। তবে প্রথম আলোচনা লিখেছিলেন কবি-প্রাবন্ধিক খুরশীদ আলম বাবু, ঢাকা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক পালাবদল-এ। তখন এই পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কবি আল মাহমুদ। এরপরে আরও কয়েকটা আলোচনা বিভিন্ন পত্রিকা ও লিটলম্যাগে প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে মোট আটটি গল্প গ্রন্থিত হয়েছিল, ক্রম অনুসারেÑ ‘কাক’, ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’, ‘অন্ধগলি’, ‘কারফিউ’, ‘পিছুটান’, ‘ভগ্নযাত্রা’, ‘বৃত্ত’ ও ‘বাঁচামরা’।

১৯৮৮ সালে আমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম। সেখানে বহরমপুরের বিখ্যাত ‘রৌরব’ সাহিত্যগোষ্ঠীর প্রাবন্ধিক আকরাম আলি, কথাশিল্পী রকিবউদ্দীন ইউসুফ এবং ‘রৌরব’ সম্পাদক শুভ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। এই তিনজনের অনুপ্রেরণায় আমি মুর্শিদাবাদের রমনা গ্রামে বসে একটি গল্প লিখি। ‘শরণার্থী’ নামের ওই গল্পটি ওই বছর ‘রৌরব’-এর শারদীয় সংখ্যায় ছাপা হয়। সম্পাদকীয়তে এই গল্প সম্পর্কে কিছু প্রশংসামূলক কথা লিখেছিলেন শুভ চট্টোপাধ্যায়। দেশে ফিরে পরিচয় ঘটে ওই সময়ের তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল কবি ও প্রাবন্ধিক খুরশীদ আলম বাবুর সঙ্গে। তার প্রেরণায় পুরোপুরি গল্প লেখায় মন দেই। ‘শরণার্থী’ গল্পটিকে পুনরায় লিখি। সেটা ঢাকার জনপ্রিয় ‘নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’-এ ‘হাত বাড়াও’ নামে ছাপা হয়। তারপর তার সংশোধিত রূপ ‘কারফিউ এবং সখিনা’ নামে ঢাকার ‘নতুন কলম’-এ ছাপা হয়। কোলকাতার বিশিষ্ট কথাশিল্পী বীরেন শাসমল তার সম্পাদিত গল্প পত্রিকা ‘তীব্র কুঠার’-এ এই গল্পটিকে ‘কারফিউ’ নামে প্রকাশ করেন। ‘কাক’ও ছাপা হয়েছিল ‘নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’-এ। এ দুটি গল্পের জন্যে আমি বহু লেখক-পাঠকের অভিনন্দন পেয়েছি। বেশ কটা চিঠিও ছাপা হয়েছে। ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘পাক্ষিক শৈলী’তে। এই গল্পটির জন্য সম্পাদক কায়সুল হক এবং তার সহকারী কুয়াত-ইল ইসলাম আমাকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ‘অন্ধগলি’ ছাপা হয়েছিল স্বসম্পাদিত লিটলম্যাগ ‘নন্দন’-এর প্রথম সংখ্যায়, ১৯৮২ সালে।

‘বৃত্ত’ গল্পটির একটি ইতিহাস আছে। সেটা ১৯৮১ সালে প্রথম লিখেছিলাম রাজশাহী মেডিকেল কলেজের বার্ষিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার জন্যে। তখন আমি প্রথম বর্ষের ছাত্র। এই প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক ছিলেন হাসান আজিজুল হক। গল্পটি পড়ে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। একদিন তাঁর কাছে গেলাম। তিনি আমার ভূয়সী প্রশংসা করলেন, কিছু ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে দিলেন, এবং কিছু পরামর্শও দিলেন। গল্পটিকে আমি নতুন করে লিখলাম। সেটি ছাপা হয়েছিল রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সরকারী পত্রিকা দৈনিক বার্তার ‘রবিবাসরীয় সাহিত্য’ পাতায় (সম্পাদক গল্পের নাম বদলে রেখেছিলেন ‘খাঁচায় একা’)। পরে সেটিকে আরও সংবদ্ধ করি এবং নাম দেই ‘বৃত্ত’। সেটি সম্ভবত ঢাকার মাসিক অঙ্গীকার ডাইজেস্ট-এ ছাপা হয়েছিল। ‘পিছুটান’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘পাক্ষিক পালাবদল’-এ। এই গল্পটিও লেখক-পাঠকদের প্রশংসা পেয়েছিল। ‘ভগ্নযাত্রা’ মাসিক অঙ্গীকার ডাইজেস্ট-এ, এবং ‘বাঁচামরা’ দৈনিক জনতার সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত হয়।

তখন আমি খুব রাজনীতিতাড়িত ছিলাম। প্রলেতারিয়েত সাহিত্যের প্রতি ছিল প্রবল ঝোঁক। তার ছায়াপাত এই সময়কার লেখাগুলোয় পাওয়া যাবে। বিষয়ভাবনার দিক থেকে ‘কারফিউ’ স্বৈরাচারবিরোধী গল্প। ‘কাক’-এ শোষণ, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র আছে। ‘বৃত্ত’তে মধ্যবিত্তের গণ্ডিবদ্ধ জীবনাবর্তনের ছবি ফুটে উঠেছে। ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’ মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত একটি কৃষক পরিবারের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে লেখা। ‘অন্ধগলি’ গল্পটি দারিদ্র্য ও শোষণের একটি অনবদ্য চিত্র। পচা গণবিরোধী রাজনীতির পরিচয় মেলে ‘ভগ্নযাত্রা’ গল্পে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কীভাবে একটি পরিবারের রক্তসম্পর্ককে বিষাক্ত, জটিল ও ভঙ্গুর করে তুলছে, আবার কীভাবে তাকে পুনর্নির্মাণ করছে তার আলেখ্যচিত্র ‘পিছুটান’ গল্পটি। ‘বাঁচা-মরা’ কিছুটা প্রলেতারীয়, অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক ইউটোপিয়ার গল্প।

অন্যদিক থেকে দেখলে ‘কাক’, ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’, ‘পিছুটান’ ও ‘বাঁচা-মরা’ পুরোপুরি গ্রামের গল্প। অন্য গল্পগুলি শহরের পটভূমিতে লেখা, তবে তার মধ্যে গ্রামের ছায়াও রয়েছে।

কাক ও কারফিউ-এর গল্পগুলিকে একটি মাত্র সাধারণ তকমা পরালে বলতে হয় এগুলি সমাজবাস্তবতার গল্প। ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’, ‘পিছুটান’ ও ‘বৃত্ত’ গল্পে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণও গুরুত্ব পেয়েছে।

অনেকের বিবেচনায় বিষয়চেতনা, ভাষা এবং শিল্পসৌকর্যের নিরিখে এই গ্রন্থের ‘কাক’, ‘কারফিউ’, ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’, ‘পিছুটান’ ও ‘বৃত্ত’ প্রথম শ্রেণীর গল্প। ‘কাক’, ‘কারফিউ’ এবং ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’ কয়েকটি গল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বাংলা একাডেমীর তৎকালীন পরিচালক আনিসুর রহমান ‘চতুর্ভুজ: চার তরুণের গল্প’ (২০০১) নামক এক গল্প সংকলনে আমার তিনটি গল্প অন্তর্ভুক্ত করেন। এর মধ্যে ছিল কাক ও কারফিউ গ্রন্থের ‘মেঘভাঙ্গা রোদ’ গল্পটি। তিনি সম্পাদকীয়তে লিখেছেন, ‘...তিনি গল্পের মধ্যে মনন, মানুষের অন্তর্জগতের বিচিত্র রহস্য এবং তীক্ষè ও নির্মোহ জীবন-জিজ্ঞাসা গেঁথে গেঁথে দেন। গল্পকে তিনি ব্যবহার করেন আত্ম-বিশ্লেষণ ও আত্ম-আবিষ্কার অর্থাৎ জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের মাধ্যম হিসেবে। ...গল্পের বয়নপ্রক্রিয়ায় নাজিব ওয়াদুদ নির্মোহ। নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় প্রকৃতিকেও তিনি মানুষের মতো প্রাণবন্ত ও ভূমিকাশ্রয়ী করতে চেয়েছেন। বাক্যের গতিশীলতা, চরিত্র ও পরিবেশ উপযোগী শব্দ চয়ন, কৌতুক ও বিদ্রুপের অভিঘাত, তীক্ষè ও ইঙ্গিতময় সংলাপ এবং মূল কথা-বয়নে স্থানিক শব্দ ও মেজাজ প্রয়োগ করে তিনি গল্পের ভাষাকে নিটোল ও উপভোগ্য করেন।’

কথাশিল্পী রফিকুর রশীদ বলেন, ‘...নাজিব ওয়াদুদ তাঁর গল্পে জীবনের ভাঁজ খুলে খুলে আলো-আঁধার, আনন্দ-বেদনা, সারল্য-কুটিলতার বন্ধন উন্মোচন করেন। তাঁর গল্পের চরিত্রেরা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা ইজমের ফ্রেমবন্দী জীবনকে উপস্থাপন করে না, শিল্পী হিসেবে এখানেই ওয়াদুদের সার্থকতা। আর সেই সঙ্গে আছে আঞ্চলিক ভাষার জাদুকরী ব্যবহার।’

কবি-প্রাবন্ধিক খুরশীদ আলম বাবু বলেছেন, ‘...নাজিব ওয়াদুদ ভীষণভাবে রাজনীতি সচেতন। তবে...তিনি রাজনীতি বলতে কোনো দলবাজি বা আদর্শবাজি বোঝেননি এবং তথাকথিত প্রতিবাদী গোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে অশিল্পের ক্যারাভানে রথ চালাননি। তার গল্পে থাকে শিল্পের আমেজ...।’

কবি-প্রাবন্ধিক ড. ফজলুল হক তুহিন ‘বৃত্ত’ গল্পের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘তিনি একটি সাধারণ বিষয়কে, ঘটনাকে অবলম্বন করে প্রতীকের সাহায্যে জীবনের অনেক গভীরে প্রবেশ করেন, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে চলে যান। এবং গল্পকে একটা স্তরে নিয়ে আসেন, অতঃপর থেমে যান, একটা নতুন মাত্রায় গল্পকে উপনীত করেন। অবশ্য সেটা করেন শিল্পসম্মতভাবেই।’

গল্পকার আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ বলেন, ‘তার গল্পের স্বাতন্ত্র্য ও আধুনিকতা নির্মিত হয় কাহিনী-চরিত্র-ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার অনুপম গদ্যের সমন্বয়ে। চিত্রকল্প-উপমা-রূপক যথাযথভাবে প্রয়োগ করে তিনি একদিকে অসম্ভব গতিশীল ও যাদুময় সংলাপ সৃজন করেন, অন্যদিকে চরিত্রের মনোজাগতিকতা পরিস্ফুটনের উদ্দেশ্যে নানা উপাচার, নন্দনভাবনার বিভিন্ন প্রকৌশল এবং তা উপস্থাপনের ঐশ্বর্যময় ভাষিক আয়োজন করেন সহজ কিন্তু পরিকল্পিত বয়ানে।’

কথাশিল্পী মঈন শেখ বলেন, ‘নাজিব ওয়াদুদ...ছেঁকে তুলেছেন বাস্তবের অন্তরশাঁসকে। তার গল্পে যতটা চিত্রিত হয়েছে বহির্জগত তার অধিক স্থান পেয়েছে ব্যক্তি ও সমাজের দোলাচলবৃত্তি, আর কখনো ব্যক্তির আরণ্যক অন্তর্ভুবন। ...ভাষার গুণে তার রচনা আশ্চর্য সংযত, সংহত ও নিরুত্তেজ গভীর; অথচ গম্ভীর নয়।’

এ রকম আরও অনেকে অনেক রকম মূল্যায়ন করেছেন।

পাঠক-সমালোচক কী বললেন তা অবজ্ঞার বিষয় নয়। তবে লেখকের প্রথম বই অনেকটা তার প্রথম সন্তানের মতো। তাই যদি কেউ খারাপ কিছু বলেনও তবুও আমার প্রথম বই ‘কাক ও কারফিউ’-এর প্রতি আমার হৃদয়ের চোরা টান থেকেই যাবে।