# পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় তেহরান

# বার্তা আদান-প্রদান তুরস্কের

# মধ্যপ্রাচ্যে সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে ১৫ দফার একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল বুধবার পাকিস্তানের দুই সরকজারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি এ তথ্য জানিয়েছে। এদিকে যুদ্ধবন্ধে ইরান পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। এরমধ্যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করা এবং যুদ্ধের কারণে ক্ষয়ক্ষতির জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চোয়েছে তারা। তেহরান সাময়িক নয় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিও চায়। এর বাইরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা পালন করছে আঙ্কারা। এছঅড়া আলোেেচনা প্রস্তাবের মধ্যেই মধ্যপ্রার্চে আরো কয়েক হাজার সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্স, বিবিসি, এপি, মিডল ইস্টআই, মিডল ইস্ট মনিটর, আল-জাজিরা।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পেয়েছে ইরান

চলমান যুদ্ধ বন্ধে ইরানকে ১৫ দফার একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল বুধবার পাকিস্তানের দুই সরকারি কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। তবে তেহরান এখনও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও ধরনের আলোচনায় বসার খবর অস্বীকার করে আসছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এই প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও এই ১৫ দফার অন্তর্ভুক্ত।

বিশদ বিবরণ প্রকাশের অনুমতি না থাকায় ওই কর্মকর্তারা নাম গোপন রেখে এই তথ্য জানিয়েছেন। তবে ইরান এখনও তাদের অবস্থানে অনড়।

তেহরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা কোনও ধরনের আলোচনায় লিপ্ত নয়। এমনকি গতকাল বুধবার ইরানের এক সামরিক মুখপাত্র ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নিয়ে উপহাসও করেছেন।

১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবে কী আছে, শর্ত মানলে ইরান কী পাবে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও মার্কিন ও ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত প্রকাশ হয়েছে।

ইসরাইলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শান্তি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির প্রভাব কমিয়ে আনা।

শান্তি প্রস্তাবে ইরানের প্রতি প্রধান শর্তসমূহ:

১. ইরানের নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা পুরোপুরি বন্ধ এবং ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

২. ইরানের সব ধরনের পারমাণবিক কর্মকা-ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পূর্ণ তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (প্রক্সি) সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এসব গোষ্ঠীকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেওয়া থেকে ইরানকে বিরত থাকতে হবে।

৪. বর্তমানে ইরানের যেসব পারমাণবিক সক্ষমতা রয়েছে, তা পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে।

৫. ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না—এমন লিখিত অঙ্গীকার দিতে হবে।

৬. ইরানের ভূখ-ে কোনো পারমাণবিক উপাদান সমৃদ্ধ করা যাবে না। বর্তমানে থাকা সব সমৃদ্ধ উপাদান আইএইএর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

৭. কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সব সময়ের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং একে একটি ‘মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।

৮. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে হবে; যা কি না শুধু আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহার করা যাবে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে দেওয়া ইরানের শর্তগুলো কী

ইরান যদি এসব শর্ত মেনে নেয় তবে বিনিময়ে তারা নিচের সুবিধাগুলো পাবে:

১. বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বুশেহর শহরে একটি বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্প গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা দেবে।

২. ইরানের ওপর থাকা সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

৩. ভবিষ্যতে আর কখনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে না—এমন নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা চলাকালীন এক মাসব্যাপী একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস বা ইরান সরকার—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব বা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে পাঁচ শর্ত দিল ইরান

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান পাঁচটি শর্ত দিয়েছে বলে গত সোমবার হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত পরোক্ষ আলোচনার অংশ হিসেবে এই সংঘাত নিরসনে ইরান কিছু কঠোর আনুষ্ঠানিক দাবি তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি কর্মকর্তারা এ নিশ্চয়তা চাইছেন যে যুদ্ধ আর নতুন করে শুরু হবে না। পাশাপাশি তাঁরা হরমুজ প্রণালির জন্য এমন একটি নতুন ব্যবস্থা চাচ্ছেন, যার মাধ্যমে ওই এলাকা কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। সেই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণও চেয়েছে তারা।

এ ছাড়া বিদ্বেষপূর্ণ সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে ইরান। তাদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা শত্রুভাবাপন্ন কার্যকলাপে জড়িত সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের বা ব্যক্তিদের তাদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে অথবা তাঁদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এর আগে সোমবার ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন বেশ কিছুদিন ধরে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং ‘এবার তারা (ইরান) বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে’।

সাময়িক নয়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় ইরান

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সাথে আলোচনায় বলেছেন, সাময়িক নয়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় ইরান।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, মি. আরাঘচি মি. ই-কে বলেছেন, ইরান শুধু অস্থায়ী নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী।

হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করে মি. আরাঘচি বলেছেন, হরমুজ সবার জন্য উন্মুক্ত এবং জাহাজগুলো নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে।কিন্তু বর্তমানে শত্রু দেশগুলোকে সে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না। -- বিবিসি বাংলা চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত কথোপকথনের বিবরণ থেকে আরো জানা যাচ্ছে, ওয়াং ই বলেছেন, ‘যুদ্ধের চেয়ে আলোচনা করা সবসময় শ্রেয়। তিনি সকল পক্ষকে শান্তির জন্য প্রতিটি সুযোগ ও সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে যত দ্রুত সম্ভব শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে তুরস্ক

তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল একে পার্টির পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাইস চেয়ারম্যান হারুন আরমাগান রয়টার্সকে বলেছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ‘বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা পালন করছে’ আঙ্কারা।

হারুন বলেন, এই বার্তাগুলোর মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা কমানো এবং সরাসরি আলোচনার পথ প্রশস্ত করা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গেই তুরস্কের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে মিলে একটি সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

আলোচনার প্রস্তাবের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে

আরও কয়েক হাজার সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য আগ্রাসন সাময়িকভাবে স্থগিত করলেও মধ্যপ্রাচ্যে আরও কয়েক হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন—এমনটাই জানিয়েছে রয়টার্স।

খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর এলিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের হাজারো সেনা সদস্যকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হতে পারে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানে এমন দুটি সূত্র জানায়, সেনারা বর্তমানে নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থান করছে। তবে তারা ঠিক কোথায় এবং কবে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে মন্তব্য না করে হোয়াইট হাউসের দিকে প্রশ্ন পাঠিয়েছে, যদিও সেখান থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

একটি সূত্র জানিয়েছে, আপাতত ইরানে সরাসরি সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে এই মোতায়েন পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এর আগে গত সপ্তাহে ইউএসএস বক্সার যুদ্ধজাহাজে করে হাজারো মেরিন ও নৌসেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর সঙ্গে একটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট ও সহায়ক যুদ্ধজাহাজও রয়েছে।