পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২০৫ আসনে জয় পেয়ে ম্যাজিক ফিগার ১৪৮ এর অনেক উপরে অবস্থান করছে বিজেপি। আসামে এনডিএ জোট ১৫১টি আসনে এগিয়ে আছে। এদিকে কেরালায় কংগ্রেস এগিয়ে এবং বিজেপি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জানা গেছে। এনডিটিভি, রয়টার্স, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে।

পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পথে বিজেপি

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ফলাফল গণনায় এক অভাবনীয় রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

সবশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এককভাবে ২০৫ আসনে জয় পেয়ে ম্যাজিক ফিগার ১৪৮-এর অনেক উপরে অবস্থান করছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তৃনমূল কংগ্রেস এখন পর্যন্ত ৮২ আসনে জয় পেয়েছে।

বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ পড়ার পর অনুষ্ঠিত এই প্রথম নির্বাচনেই রাজ্যের শাসকদল বড়সড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ল।

এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই ছিল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই নির্বাচনে বিজেপির প্রধান মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

গত নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করার পর এবার তিনি মমতার খাসতালুক বলে পরিচিত ভবানীপুর কেন্দ্রে সরাসরি লড়াই করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। বিজেপি এবং তৃণমূল ছাড়াও এই লড়াইয়ে বাম-কংগ্রেস জোট এবং তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের নবগঠিত দলও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই ভোটের সমীকরণকে প্রভাবিত করেছে।

রাজ্যের ২৯৪টি আসনের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। বুথফেরত সমীক্ষাগুলো কোনো নির্দিষ্ট দলের নিরঙ্কুশ জয়ের আভাস দিতে না পারলেও, গণনার শুরু থেকেই বিজেপি বড় ব্যবধানে এগিয়ে যেতে শুরু করে। ২০২১ সালের নির্বাচনে যেখানে তৃণমূল ২১৫টি আসন পেয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল এবং বিজেপি ৭৭টি আসনে থমকে গিয়েছিল, সেখানে এবারের ফলাফল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী চিত্র তুলে ধরছে। গতবার বাম এবং কংগ্রেস কোনো আসন না পেলেও, এবার তাদের প্রাপ্তি বা ভোট কাটাকাটির প্রভাব শাসকদলের জন্য চড়া মূল্য নিয়ে এসেছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল, যদিও ফলতা ও আরও কিছু বুথে পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজন পড়েছিল। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বিজেপির পক্ষ থেকে মতাদর্শগত পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ডাক দেওয়া হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারের পতনের ১৫ বছর পর বাংলা আবারও এক বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আসামেও বিশাল জয়ের পথে বিজেপি

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ভারতের আসামের বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়ের পথে রয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। গত ৯ এপ্রিল সেখানে নির্বাচন হয়। আজ ভোট গণনা চলছে। এতে দেখা যাচ্ছে এনডিএ জোট ১০১টি আসনে এগিয়ে আছে।

আসামে ১২৬টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। সরকার গঠনের জন্য আসামের বিধানসভায় ৬৪টি আসনে জিততে হবে কোনো দল বা জোটকে। যা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ খুব সহজেই পেতে যাচ্ছে।

এনডিএর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট মাত্র ২১টি আসনে এগিয়ে আছে। দুটি আসনে এগিয়ে এআইইউডিএফ জোট। সর্বশেষ নির্বাচনে অন্যান্য দল চারটি আসন পেলেও এবার তারা খালি হাতে ঘরে ফিরবে।

নিরঙ্কুশ জয়ের মাধ্যমে আসামে আবারও এনডিএ সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন হিমান্ত বিশ্ব শর্মা।

সর্বশেষ নির্বাচনে বিজেপির এনডিএ জোট পেয়েছিল ৭৩টি আসন। এবার তারা আরও ২৮টি বেশি আসনে জিততে যাচ্ছে। অপরদিকে অবনতি হয়েছে কংগ্রেস জোটের। তারা গতবার ৩১টি আসন পেলেও এবার ১০টি আসন কম পাবে।

কেরালায় এগিয়ে কংগ্রেস, চরম বিপর্যয়ের মুখে বিজেপি

ভারতের সর্বদক্ষিণের রাজ্য কেরালার বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনাও চলে সোমবার। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কেরালায় ক্ষমতাসীন সিপিএম থেকে বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছে কংগ্রেস, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ-আসামে জয়ের পথে থাকলেও দক্ষিণের এই রাজ্যে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিজেপি।

কেরালার বিধানসভার মোট আসন ১৪০টি। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত কেরালার বিধানসভা ছিল বামপন্থি দল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসিস্ট) বা সিপিএমের দখলে। তবে এবারের নির্বাচনের ফলাফল এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, সিপিএমের শাসন শেষ হওয়ার বার্তা মিলছে।

গত এপ্রিলে ভারতের ৪ টি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। আসাম, পদুচেরি ও কেরালায় ৯ এপ্রিল হয়েছিল ভোটগ্রহণ, আর পশ্চিমবঙ্গে ভোটগ্রহণ হয়েছে ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল— এই দু’দিন। অপরদিকে তামিলনাড়ুতে ভোট হয় ২৩ এপ্রিল।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ রাজ্য বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খেলা শেষ। এ রাজ্যে বিজেপিই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

রাজ্য বিজেপির নেতাকর্মীরা বিজয় উৎযাপন করছেন। জয়ের পথে থাকা বিজেপি সরকার গঠন করলে কে হতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী, সে আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে।

এ নির্বাচনের আগে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার জোর দিয়ে বলেছিলেন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন বাঙালিই হবেন।

বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী কে হতে পারেন, এ প্রশ্নের উত্তরে সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তাঁরা হলেন বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, সাবেক সাংবাদিক ও রাজ্যসভার সাবেক সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত প্রমুখ।

ভোট গণনার মধ্যে কোচবিহারে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার মধ্যে সোমবার দুপুরে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

সবশেষ অশান্তির ঘটনা ঘটে, কোচবিহারের দিনহাটায়। সেখানে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।

পরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

দিনহাটায় বিজেপির প্রার্থী অজয় রায়, তৃণমূলের উদয়ন গুহ। গণনা করা ভোটের সবশেষ প্রবণতায় দেখা যায়, অজয় রায় ১০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।

নিজ আসনে হেরে গেলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিন তার নিজ আসনেই হেরে গেছেন। তাকে হারিয়েছেন অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে-এর প্রার্থী ভিএস বাবু।

এমকে স্টালিন সেখানকার কোলাথুর নামের আসনে নির্বাচন করেন। এবার তিনি শুধুমাত্র একটি আসনেই দাঁড়িয়েছিলেন। আর সেটিতে হেরে গেছেন।

তামিলনাড়ুতে এবারই প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে থালাপতি বিজয়ের টিভিকে। আর প্রথম নির্বাচনে একক সর্বোচ্চ আসনে জয় পেতে যাচ্ছে তারা। এতে করে থালাপতি বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১১টি আসনে জয় পায় টিভিকে। তারা আরও ৯৬টি আসনে এগিয়ে ছিল।

অপরদিকে মুখ্যমন্ত্রী স্টালিনের ক্ষমতাসীন দল ডিএমকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চারটি আসনে জিতেছে। আর ৬৭টি আসনে এগিয়ে আছে।

তামিলনাড়ুতে ২৩৪টি আসনে গত ২৩ এপ্রিল নির্বাচন হয়। আজ সেখানে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। ভোট গণনার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, থালাপতি বিজয়ের দল চমক দেখাতে যাচ্ছে। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জয়ের পাল্লা ভারী হতে থাকে।

তামিলনাড়ুতে যদি কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চায় তাহলে তাদের ১১৮টি আসনে জয় পেতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে থালাপতির দল এককভাবেই এরচেয়ে বেশি আসন পাবে। আর না হলে জোট গঠন করে ক্ষমতায় যাবে টিভিকে।