এক্সে, রয়টার্স
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি অজানা আতঙ্কে থমকে গেছে। আটত্রিশ বছর আগের রক্তাক্ত ইতিহাস ফিরে আসছে নতুন মোড়কে। ১৯৮৭ সালে ফারসি দ্বীপ থেকে রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে ভেসে যাওয়া একটি ছোট নৌকা বুঝিয়ে দিয়েছিল, মহাসমুদ্রের বুকে বিশালাকার মার্কিন রণতরীকে ধরাশায়ী করতে কোনো পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন নেই, নীরব ঘাতক গুটিকতক সামুদ্রিক মাইনই যথেষ্ট। সে সময় ৪ লক্ষ ১৪ হাজার টনের অতিকায় মার্কিন তেল ট্যাঙ্কার এসএস ব্রিজেটনকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে ইরান প্রমাণ করেছিল, রণকৌশল আর সাহসের কাছে আধুনিক নৌশক্তিও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে।ব্রিজেটন বিস্ফোরণটি ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে চরম অস্বস্তিকর অধ্যায়।
অপারেশন আর্নেস্ট উইল-এর অধীনে কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলিকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে অত্যাধুনিক মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো যখন দিশেহারা, তখন ইরান একটি বুলেট খরচ না করেই মার্কিন রণসজ্জাকে টলিয়ে দিয়েছিল। অবাক করা বিষয় ছিল এই, মাইনের আঘাত পাওয়ার পর মাইন শনাক্তকরণ ব্যবস্থার অভাবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলি নিজেই ব্রিজেটনের পেছনে আশ্রয় নিয়েছিল। তেহরান সেদিন বিশ্বকে দেখিয়েছিল, মাত্র ১৫ ডলারের প্রযুক্তি দিয়ে হাজার হাজার কোটি ডলারের সামরিক সম্পদকে নিস্তেজ করে দেওয়া সম্ভব।সেই একই রণকৌশল আজ ২০২৬ সালেও হরমুজ প্রণালীকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
ইসরায়েলের সাথে সংঘাতের আবহে ইরান ফের জলপথের নিচে পেতে রেখেছে আধুনিক মাইনের মরণফাঁদ। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে মাহম-৩ থেকে মাহম-৭ সিরিজের অসংখ্য মাইন বিছিয়ে রাখা হয়েছে। মাহম কোনো সাধারণ মাইন নয়, এটি ইরানের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এমন এক আধুনিক সংস্করণ যা মাসের পর মাস পানির নিচে সক্রিয় থাকতে পারে। এর বিশেষ আবরণ সোনার সিগন্যাল শুষে নেয়, ফলে আধুনিক স্ক্যানারে একে সমুদ্রের নিচের সাধারণ পাথর থেকে আলাদা করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।বহুমুখী সেন্সরের কারণে মাহম মাইনের ভয়াবহ। এটি শুধু জাহাজের চৌম্বকক্ষেত্র নয় বরং ইঞ্জিনের অতি সামান্য কম্পন এবং পানির চাপের সামান্যতম পরিবর্তনও নিঁখুতভাবে শনাক্ত করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মাইন সরানোর জন্য ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেও সমুদ্রের তলদেশের এই নীরব ঘাতকগুলো গোটা বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব এতটাই যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা হলো আমেরিকার বর্তমান প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। ২০২৫ সালে আমেরিকা তাদের পুরনো মাইন সুইপার বা মাইন সাফাইকারী জাহাজগুলো অবসরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাদের নতুন লিটেরাল কমব্যাট শিপগুলো ড্রোন এবং হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভরশীল, যা সমুদ্রের তলদেশে ঘাপটি মেরে থাকা মাহম মাইনের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে উন্নত বিশ্বের চোখ এখন ব্রিটিশ প্রযুক্তির দিকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই মাইন মোকাবিলায় ব্রিটিশ নৌবাহিনী বা রয়্যাল নেভি এক কিংবদন্তি নাম।ব্রিটেনের ঐতিহাসিক 'ডিগসিং' ( চৌম্বকত্ব দূরীকরণ পদ্ধতি) এক সময় জার্মান মাইন থেকে বহু জাহাজকে রক্ষা করেছিল। আধুনিক যুগে এই প্রযুক্তির আরও বিবর্তন ঘটেছে।স্কটল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায় রয়্যাল নেভির বিশেষ ম্যাগনেটিক সিগনেচার রেঞ্জ রয়েছে, যেখানে যুদ্ধ জাহাজগুলোর চৌম্বকীয় উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। তবে ইরানি মাহম মাইন এই আধুনিক ডিগসিং প্রযুক্তির ফাঁকফোকরগুলো চেনে।
জাহাজ যত বেশি নিঃশব্দ হওয়ার চেষ্টা করছে, মাহম মাইনের সেন্সরগুলোকে তত বেশি সংবেদনশীল করে গড়ে তুলেছে তেহরান।২০২৬ সালের শুরুতে ব্রিটেন তাদের প্রথাগত মাইন হান্টার জাহাজগুলো সরিয়ে নিয়ে নতুন প্রোটোটাইপ প্রযুক্তি মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছিল। কয়েকশো ছোট রোবটিক সাবমেরিন, হেলিকপ্টার থেকে নীল-সবুজ লেজার রশ্মি নিক্ষেপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে মাহম মাইন শনাক্ত করার কাজ শুরু ।