রয়টার্স, আল-জাজিরা, এএফপি : ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার পর উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ভয়াবহ এ হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হন, যাঁদের অধিকাংশ শিশু শিক্ষার্থী। ইরানে নির্বিচার হামলার জন্য নিজ দেশেই সমালোচনার মুখে পড়ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকিকে ‘নিন্দনীয় ও ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা। আর ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্যে শতাধিক মার্কিন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এমন হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।

ওই বিশেষজ্ঞরা এমন বক্তব্য দিয়েছেন একটি খোলাচিঠিতে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই চিঠিতে সই করা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছেন হার্ভার্ড, ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘শুধু মজার জন্য’ ইরানে হামলা চালাতে পারে মার্কিন বাহিনী। ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই এই খোলাচিঠি দেওয়া হয়েছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছিলেন, যুদ্ধের ‘বোকামিপূর্ণ’ নিয়মগুলো মাথায় রেখে লড়ছে না যুক্তরাষ্ট্র। সেদিকে ইঙ্গিত করে দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল-জাজিরাকে বলেন, হেগসেথের এমন বক্তব্য নজিরবিহীন। তাঁর এই বক্তব্য এবং বেসরকারি স্থাপনায় হামলা নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি ইরানে যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের খোলাচিঠিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলো যেটা করছে এবং দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন এবং আসন্ন কোনো ইরানি হুমকির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছিল বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের চিঠিতে বলা হয়, ‘অন্য একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ শুধু তখনই অনুমোদন পায়, যখন তা প্রকৃত বা আসন্ন সশস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য করা হয় অথবা যখন তা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নিয়ে করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ এই হামলার অনুমোদন দেয়নি। ইরান ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ করেনি।’ বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তের বৈধতা; যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি; উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হুমকিমূলক বক্তব্য এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার নীতি লঙ্ঘনÍএই চারটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। আইনবিশেষজ্ঞরা যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। এই হামলায় অন্তত ১৭৫ জন মানুষ প্রাণ হারান, যাঁদের অধিকাংশই শিশু। সেই সঙ্গে ইরানের বিভিন্ন হাসপাতাল, পানি পরিশোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে যেসব হামলা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা খুব বেশি উদ্বিগ্ন।’ খোলাচিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক প্রধান কেনেথ রথ, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আইন উপদেষ্টা হ্যারল্ড হংজু কোহ এবং ইয়েল ল স্কুলের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক এবং আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল–এর প্রেসিডেন্ট ওনা এ হ্যাথাওয়ে, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ অ্যালস্টোন।

জাতিসংঘের যুদ্ধবিষয়ক রীতিনীতি নিয়ে একটি সনদ রয়েছে। সেটি জেনেভা সনদ নামে পরিচিত। সে অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, সেতুর মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো যাবে না। ট্রাম্প বুধবার ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই দেশটিতে এমন স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। প্রথম দিনেই মিনাব শহরে স্কুলে হামলা চালিয়ে শিশুসহ ১৭৫ জনকে হত্যা ছাড়াও ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে হামলা চালানো হয়েছে।

এমনকি গোলেস্তান প্রাসাদ, মসজিদ-ই-জামে ও চেহেল সোতুন প্রাসাদের মতো ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা স্থাপনাগুলোও রেহাই পায়নি। ইরানের সবচেয়ে পুরোনো স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনা পাস্তুর ইনস্টিটিউটেও হামলা হয়েছে।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির গত মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এ সময় দেশটিতে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে তেহরান সরকার। আহত হয়েছেন ২৬ হাজারের বেশি। এ ছাড়া প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়েছেন বহু মানুষ।