নিউইয়র্ক টাইমস : এতদিন ধারণা করা হতো বিশ্বরাজনীতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া—এই তিনটি শক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ভিন্ন এক সমীকরণ সামনে নিয়ে এসেছে। অর্থনীতি বা প্রথাগত সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে ‘চতুর্থ বৈশ্বিক শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ইরান।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে সংঘাতের জেরে ইরান এই রুটে আংশিক সামরিক অবরোধ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে না; মাঝে মাঝে দু-একটি জাহাজে হামলা বা হুমকির মাধ্যমেই তারা বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। এর ফলে বীমা খরচ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তার অভাবে জাহাজ চলাচল ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
বিশ্লেষণ বলা হয়েছে, আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি কেবল তেলের ওপর নয়, বরং এর ‘নির্ভরযোগ্য সরবরাহের’ ওপর টিকে আছে। যখন এই নির্ভরযোগ্যতা ভেঙে পড়ে, তখন সরবরাহ ব্যবস্থা আর সাধারণ বাজার লেনদেন থাকে না, বরং তা একটি জটিল কৌশলগত সমস্যায় পরিণত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রতিটি জাহাজকে পাহারা দেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন। অন্যদিকে, ইরানের জন্য সামান্য ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলাই যথেষ্ট। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন যে, শক্তি প্রয়োগ করে এই পথ খোলা রাখা বাস্তবসম্মত নয়। এটি কেবল ইরানের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্ভব।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানির জন্য এই অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ দেখা দিতে পারে, যা ১৯৭০-এর দশকের সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে ইরান, রাশিয়া ও চীন—এই তিন শক্তির স্বার্থ মিলে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যতের এক অন্ধকার চিত্র তুলে ধরে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি ইরান (২০ শতাংশ), রাশিয়া (১১ শতাংশ) এবং চীন মিলে একটি জ্বালানি জোট বা কার্টেল তৈরি করে, তবে তারা বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। এতে পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাবে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এই জোটের দিকে ঝুঁকে পড়বে।
সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হয় তাদের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে, নয়তো ইরানকে একটি বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বিশ্বব্যবস্থাকে অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে দেওয়ার এক রূপান্তরমূলক অধ্যায়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে যে শর্ত চায় আমিরাত
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যেকোনো চুক্তিতে হরমুজ প্রণালির অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সতর্ক করে বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথকে কোনো দেশই ‘জিম্মি’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না। খবর দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের।
সম্প্রতি, সাপ্তাহিক এক ব্রিফিংয়ে আনোয়ার গারগাশ জানান, আমিরাত যুদ্ধের অবসান চায়, তবে তা যেন কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি না হয়। তিনি বলেন, আমরা এমন কোনো চুক্তি চাই না যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার মতো মূল সমস্যাগুলোকে আড়ালে রেখে দেয়। এগুলো সমাধান না হলে মধ্যপ্রাচ্য আরও বেশি বিপজ্জনক ও অস্থির হয়ে উঠবে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। গারগাশের মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো দেশই এই জলপথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না এবং নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা যেকোনো শান্তি চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রবিবার তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক হুশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি ইরানকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে চুক্তি না করলে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে তেহরানে ‘নরক’ নামিয়ে আনা হবে। অন্যদিকে, গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আমিরাত সবচেয়ে বেশি ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। আনোয়ার গারগাশ বলেন, আমিরাতের জন্য এটি ছিল ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’, যা এখন বাস্তবে ঘটছে। তবে তিনি দাবি করেন, এই চাপের মধ্যেও আমিরাতের অর্থনীতি শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
ইরানের এই কৌশল আরব দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরানোর বদলে উল্টো ওয়াশিংটনের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেন গারগাশ। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রই আমিরাতের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে থাকবে। এছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সহায়তার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পরিশেষে তিনি বলেন, আমিরাত ইরানের সাথে শত্রুতা চায় না, তবে বর্তমান তেহরান সরকারের ওপর আস্থা রাখা অসম্ভব। তাদের এই ধ্বংসাত্মক নীতি কেবল শাসকগোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য, দেশের মঙ্গলের জন্য নয়।