ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালী এখন টালমাটাল। দীর্ঘ পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের মধ্যে তেহরান দাবি তুলেছে, হরমুজ তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে এবং সেখান থেকে তারা টোলও আদায় করবে। ইরান চাইছে তাদের উপকূলে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি তেলবাহী জাহাজ থেকে নির্দিষ্ট হারে ট্রানজিট ফি (যাতায়াত মাশুল) আদায় করতে। তবে এই দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়েছে জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো, যারা বলছে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট কোনো প্রণালীতে এমন টোল আদায় পুরোপুরি অবৈধ।
হরমুজ প্রণালী মূলত পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই পথটি শত্রু জাহাজের জন্য রুদ্ধ করে দিলেও বর্তমানে দুই সপ্তাহের এক যুদ্ধবিরতি চলছে।
এই সময়েই তেহরান তাদের শান্তি প্রস্তাবের অংশ হিসেবে ১০টি শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে প্রধান হলো এই জলপথে টোল আদায়ের অধিকার লাভ করা। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই প্রণালী দিয়ে বিনা মূল্যে তেল পরিবহন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের নীতিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো দেশ তাদের উপকূলবর্তী প্রণালী ব্যবহারের জন্য কোনো বিদেশি জাহাজের কাছ থেকে মাশুল দাবি করতে পারে না। নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক এই জলপথগুলো দিয়ে সকল দেশের জাহাজের অবাধ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে। তবে কোনো রাষ্ট্র যদি বিশেষ সেবা যেমন পাইলটিং, টাগবোট সহায়তা বা বন্দর সুবিধা প্রদান করে, তবে কেবল সেই সেবার বিপরীতে নামমাত্র ফি নেওয়া সম্ভব। ইরান যেভাবে সাধারণ যাতায়াত মাশুল দাবি করছে, তা এই বৈশ্বিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে সুয়েজ খাল বা পানামা খালে যদি মাশুল দেওয়া যায়, তবে হরমুজ প্রণালীতে কেন নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি মৌলিক পার্থক্য, সুয়েজ এবং পানামা কোনো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি জলপথ নয় বরং এগুলো মানুষের তৈরি কৃত্রিম খাল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কৃত্রিমভাবে তৈরি এমন খালগুলোর ওপর সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব থাকে এবং তারা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের দোহাই দিয়ে ফি আদায় করতে পারে। অন্যদিকে হরমুজ একটি প্রাকৃতিক প্রণালী হওয়ায় এখানে সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।
তুরস্কের প্রণালীগুলোর দিকে তাকালে এই পার্থক্যের আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বসফরাস এবং দার্দানেলস প্রণালী ১৯৩৬ সালের মন্ট্রেক্স কনভেনশন দ্বারা পরিচালিত হয়। সেখানেও তুরস্ককে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সেবামূলক কাজের জন্য ফি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো সাধারণ ট্রানজিট ফি নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি। সিঙ্গাপুর প্রণালীর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে, যেখানে কোনো দেশ মাশুল দাবি করে না। ইরানের এই নতুন দাবি তাই আধুনিক ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা সফল হলে বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে ইরান ইতিমধ্যেই কিছু জাহাজ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে মাশুল আদায় শুরু করেছে। কোনো কোনো সংবাদ মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, অন্তত একটি জাহাজ দুই মিলিয়ন ডলার ফি দিয়ে যাতায়াত করেছে এবং তেহরান এখন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে এই অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করছে। এমনকি প্রতি ব্যারেল তেলের বিপরীতে এক ডলার করে টোল নেওয়ার কথাও ভাবছে তারা। ওমানের সাথে যৌথভাবে একটি প্রোটোকল তৈরির চেষ্টা চালালেও ওমান তাতে সায় দেয়নি, কারণ তারা জানে এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
ইরানের এই একতরফা সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার স্পষ্ট জানিয়েছে যে হরমুজ প্রণালীকে কোনো দেশই জিম্মি করে রাখতে পারে না এবং এর অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাই হবে যে কোনো শান্তি চুক্তির মূল ভিত্তি। বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য এই মাশুল বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। চীন যেহেতু এই অঞ্চলের জ্বালানির বড় গ্রাহক, তাই বেইজিংয়ের মধ্যস্থতাই এখন এই সংকটের একমাত্র কূটনৈতিক সমাধান হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।