বিবিসি, এনডিটিভি, তাসনিম : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে থাকায়, দু’দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ওমানে একটি বৈঠকে বসেছেন। এই আলোচনাটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরানে গত মাসে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়েছে, এমনটাই অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর। তাদের মতে, এই সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র করেছে। আলোচনার স্থান ও বিষয়বস্তু নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বৈঠকটি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত আলোচনা সম্ভব হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য উত্তেজনা কমানো।

দুই দেশের অবস্থান এখনো অনেকটাই বিপরীতমুখী। তবুও আশা করা হচ্ছে, আলোচনা সফল হলে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করুক এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পরিত্যাগ করুক। পাশাপাশি তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করতে আগ্রহী। অন্যদিকে, ইরান স্পষ্ট করেছে যে আলোচনা কেবল পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই মতপার্থক্য আদৌ সমাধান হয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে ইরানে হামলা চালানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হাজার হাজার সেনা, একটি বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে। এর জবাবে ইরান জানিয়েছে, কোনো হামলা হলে তারা পাল্টা জবাব দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের পর এটিই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি বৈঠক, যে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল। ইরানের দাবি, সেই হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এই আলোচনাকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা এড়ানোর শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

ইরান আশা করছে, আলোচনার বিনিময়ে তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে, যা দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে সরকারের বিরোধীরা মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে তা শাসকগোষ্ঠীর জন্য নতুন জীবনরেখা হয়ে উঠবে। আঞ্চলিক দেশগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে তা ইরানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা বা বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছে, শুধু বিমান হামলা দিয়ে ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করা সম্ভব নয়। প্রাথমিকভাবে আলোচনা ইস্তাম্বুলে হওয়ার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে ইরানের অনুরোধে স্থান পরিবর্তন করে ওমানে নেওয়া হয় এবং বৈঠকটি কেবল মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

এদিকে ইরানি ড্রোনের চমকে মার্কিন বাহিনী ভড়কে যাচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর সহজে পাওয়া যাবে না। তবে ঘটনা বলছে, ইরানি ড্রোনকে যথেষ্ট সমঝেই চলতে হচ্ছে মার্কিন বাহিনীকে। ফলে সাগরে তারা আর নিজেদের নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারছে না। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পারদ আরও চড়িয়ে আরব সাগরে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দিকে আগ্রাসীভাবে ধেয়ে আসায় আত্মরক্ষার্থে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, শাহেদ-১৩৯ মডেলের এই ড্রোনটি কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে রণতরীটির দিকে এগিয়ে আসছিল। বারবার সতর্কবার্তা এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও ড্রোনটি তার গতিপথ পরিবর্তন না করায় একটি এফ-৩৫সি যুদ্ধবিমান ড্রোনটিকে গুলি করে ভূপাতিত করে।

ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন মার্কিন রণতরীটি ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক পানি সীমায় অবস্থান করছিল। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স নিশ্চিত করেছেন, এই ঘটনায় কোনো মার্কিন সেনার হতাহত হওয়ার খবর নেই এবং রণতরীরও কোনো ক্ষতি হয়নি। এদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে এই ঘটনার ব্যাপারে সরাসরি কোনো আগ্রাসনের কথা স্বীকার করা হয়নি। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় নজরদারি মিশনে থাকা একটি ড্রোনের সঙ্গে তাদের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে কী কারণে এই বিচ্ছিন্নতা, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে ঘটেছে। একদিকে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, ঠিক তখনই এই সামরিক সংঘাত আলোচনার পরিবেশকে জটিল করে তুলতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে ওই অঞ্চলে নৌবহর পাঠানোর পর থেকেই পরিস্থিতি থমথমে ছিল। এই ড্রোন ভূপাতিতের কয়েক ঘণ্টা পরই হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানি বোট ও ড্রোন দিয়ে হয়রানি করার আরেকটি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে সেন্টকম। সামগ্রিকভাবে, আরব সাগরের এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিগত এক দশকে ইরান তাদের ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ড্রোন বহরের একটি বড় অংশ পরিচালনা করে। এই বহরে নজরদারি থেকে শুরু করে আত্মঘাতী বা ‘কামিকাজে’ হামলার উপযোগী নানা ধরনের ড্রোন রয়েছে। গত মঙ্গলবারের ঘটনায় ব্যবহৃত শাহেদ-১৩৯ মূলত ইরানের বিখ্যাত শাহেদ ড্রোন পরিবারের একটি উন্নত সংস্করণ। এটি দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে পারে এবং আগের সংস্করণগুলোর তুলনায় অনেক দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া ইরানের কাছে শাহেদ-১৩৬ এর মতো ড্রোন রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল ড্রোনটি। বিশাল পরিসরে হামলা চালাতে এবং শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তেহরান এই কামিকাজে ড্রোনগুলো ব্যবহার করে থাকে। ইরানের হাতে থাকা অন্যান্য শক্তিশালী ড্রোনের মধ্যে রয়েছে মোহাজের সিরিজ। এই সিরিজের সর্বশেষ মোহাজের-১০ ড্রোনটি প্রায় ২৪ ঘণ্টা আকাশে উড়তে পারে এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম।

এছাড়া কামিন-২২ ড্রোনটি অনেকটা মার্কিন প্রিডেটর বা রিপার ড্রোনের আদলে তৈরি করা হয়েছে, যা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত গিয়ে আক্রমণ করতে পারে। জেট ইঞ্জিনচালিত কাররার এবং রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম সায়েক ড্রোনের উপস্থিতিও ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ড্রোন বহরের ক্রমবর্ধমান বিস্তার এখন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর জন্য অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।