- পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দুর সহকারী খুন
- রাজ্যজুড়েই আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়েছেন বাংলার রাজ্যপাল আরএন রবি। এতে করে ৭১ বছর বয়সী মমতা ব্যানার্জির মুখ্যমন্ত্রীর মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এতে করে মমতার দীর্ঘ ১৫ বছরের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। ২০১১ সালে তিনি প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর টানা তিনবার এ দায়িত্ব পালন করেছেন।গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে দুইশরও বেশি আসনে জয় পায় বিজেপি। এরফলে রাজ্যটিতে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের সুযোগ পায় হিন্দুত্ববাদী দলটি। তবে প্রথা অনুযায়ী সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে করে সেখানে সাংবিধানিক সংকট তৈরির শঙ্কা তৈরি হয়। তবে এর আগেই গতকাল বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়েছেন। এখন নতুন মন্ত্রিসভা নির্বাচিত হবে এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অন্য কাউকে নির্বাচন করা হবে।
ভোট পরবর্তী সহিংসতা : পশ্চিমবঙ্গে এ পর্যন্ত নিহত ৪, গ্রেপ্তার ৪ শতাধিক
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪ জন; আর সহিংসতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৩৩ জনকে। গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) সিদ্ধনাথ গুপ্ত।সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৪ জন নিহত হয়েছেন। রাজ্যজুড়ে ২ শতাধিক মামলা হয়েছে এবং এসব মামলার আসামী হিসেবে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৩৩ জনকে। আসামীদের গ্রেপ্তারে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে।”গত ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয় পশ্চিমবঙ্গে, ৪ মে সোমবার ভোটের ফলাফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সেই দিন, অর্থাৎ সোমবার রাত থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করে সহিংসতার খবর।
ভোটের ফল প্রকাশের পর রাত থেকেই কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর শুরু করে বিজেপি সমর্থকরা, হামলা শুরু হয় তৃণমূল কর্মীদের ওপরও। আবার রাজ্যের অনেক এলাকায় বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের ওপরও চড়াও হয়েছে তৃণমূল। সেই উত্তেজনার রেশ এখনও চলছে। এ পর্যন্ত যারা নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি— উভয় দলের সমর্থকরা আছেন। সহিংসতার জন্য তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি উভেয়েই পরস্পরকে দোষারোপ করছে। গত বুধবার আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিব চন্দ্রনাথ রথ। চন্দ্রনাথ নিহত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতারা বলছেন, তৃণমূল ‘পলিকল্পিত গুপ্তহত্যা’ চালাচ্ছে।অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ সহিংসতার জন্য দায়ী বিজেপি সমর্থিত দুষ্কৃতিকারীরা।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ গতকাল বুধবার রাতে খুন হয়েছেন। চন্দ্রনাথের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ির কাছে। চন্দ্রনাথ বিজেপি নেতা শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক হিসেবে তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকতেন। এএন আই, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেক্স।
এবার বিধানসভায় ভবানীপুর আসনের নির্বাচনে শুভেন্দু দায়িত্বে রেখেছিলেন এই চন্দ্রনাথকে। তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মী। অবসর নেওয়ার পর তিনি শুভেন্দুর হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন। সেই চন্দ্রনাথ গত বুধবার রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া এলাকায় গাড়িতে করে যাওয়ার সময় পথে খুন হন। পুলিশ সূত্র বলছে, দুষ্কৃতকারীরা চন্দ্রনাথকে বেশ কিছুদিন ধরে নজর রাখছিল। পুলিশ সূত্র জানায়, গত বুধবার দুষ্কৃতকারীরা একটি গাড়ি নিয়ে চন্দ্রনাথের চলাচলের ওপর কড়া নজর রাখছিল। রাতে যখন তিনি দোহারিয়ার বাড়িতে ফিরছিলেন, তখন দুষ্কৃতকারীরা একটি গাড়ি ও দুটি মোটরসাইকেলে করে তাঁকে অনুসরণ করছিল। চন্দ্রনাথের গাড়ি কলকাতা বিমানবন্দরের ১ নম্বর গেট হয়ে মধ্যমগ্রামের দোহারিয়ার তাঁর বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। তাঁর গাড়ি যশোর রোডের ডানদিকে দোহারিয়ার দিকে ঢুকলে দুষ্কৃতকারীরা মোড়ের রাস্তায় তাঁর গাড়ি আটকে দেয়।
সূত্র জানায়, এ সময় পেছনের মোটরসাইকেলে আসা দুষ্কৃতকারীরা চন্দ্রনাথের গাড়ির কাছাকাছি এসে সামনের আসনে বসা চন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে পরপর চারটি গুলি ছোড়ে। সামনের আসনের কাচ ভেদ করে গুলি এসে লাগে চন্দ্রনাথের শরীরে। আহত হন পাশে থাকা গাড়ির চালকও। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় চন্দ্রনাথকে দ্রুত নিকটবর্তী বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। রাতেই তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বারাসাতের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই তাঁর ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা।
ঘটনা জানার পর দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যসহ বিজেপি নেতারা। ছুটে যান পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মহাপরিচালক সিদ্ধিনাথ গুপ্তাসহ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। শুভেন্দু বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের কোনো রথী–মহারথী ছাড় পাবেন না। তাঁদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে।
যে প্রাইভেট কারে করে দুষ্কৃতকারীরা চন্দ্রনাথকে খুন করতে এসেছিল, রেকি করেছিল, সেই গাড়িটি জব্দ করেছে পুলিশ। গাড়িটির নম্বরপ্লেট শিলিগুড়ির হলেও সেটি ভুয়া বলে পুলিশ জানিয়েছে। পুলিশ এখন এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল দুটি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে বিজেপির পক্ষ থেকে কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এলাকার কিছু তৃণমূল নেতা।
পশ্চিমবঙ্গে ৪৮ ঘণ্টায় ২০০ এফআইআর গ্রেপ্তার ৪৩৩, আটক ১১০০
তৃণমূল কংগ্রেসের টানা শাসনের পতন, রাজ্য শাসনে প্রথমবারের মতো বিজেপির উত্থান সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল এখন পুরো ভারতে আলোচনার কেন্দ্রে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে রাজ্যে পালাবদলের কড়া প্রভাব দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে রাজ্যজুড়েই।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক সিদ্ধনাথ গুপ্ত গত বুধবার জানান, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচন–পরবর্তী সহিংস ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ৪৮ ঘণ্টায় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে চার শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। আটক করা হয়েছে আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ৪ মে ভোটের ফলাফল ঘোষণা হয়। এর পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রতিপক্ষকে হুমকি, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
সিদ্ধনাথ গুপ্ত আরও বলেন, ‘পুলিশের কাছে ২০০টির বেশি প্রাথমিক অভিযোগ (এফআইআর) জমা পড়েছে। এখন পর্যন্ত ৪৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা আগাম সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করেছি।’
বিজেপির জেতা ১০৫ আসনেই ভোট ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটার বেশি
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭ আসনে জিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। তবে এই জয়ের পেছনে ‘বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার এক চাঞ্চল্যকর প্রভাব সামনে এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজেপির জেতা বেশিরভাগ আসনেই দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি।এই ১০৫টি আসনের মধ্যে ৮৬টিতেই আগে কখনো জয় পায়নি বিজেপি। অর্থাৎ, বিজেপি যে ২০৭ আসনে জিতেছে, তার প্রায় অর্ধেক আসনেই জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভোটার তালিকায় বড় ছাঁটাই পশ্চিমবঙ্গে মোট ২৯৪টি আসনে নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) কার্যক্রম চালানো হয়। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় মোট প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের বিষয় এখনো ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তৃণমূল কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলো আপত্তি জানালেও বিজেপি শুরু থেকেই এই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে আসছিল।