নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ ৯ মে
সহিংসতায় নিহত ৪
গ্রেফতার ৮০ জন
কলকাতার নিউমার্কেট চত্বরে বিজেপির বিজয় মিছিলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতেই মিছিল থেকে বুলডোজার দিয়ে গোশতের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাাচন পরবর্তী সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৪ জন।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেখানে বুলডোজার চালিয়ে একাধিক দোকানঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। হিন্দুস্থান টাইমস, ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভিবিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নিউমার্কেটের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে বুলডোজার দেখতে পান তারা। যেটি দিয়েই দোকান ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল। উচ্চ শব্দে ডিজে চালিয়ে বিজেপির স্লোগান “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি দেওয়া হচ্ছিল।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনার একটি ভিডিও পোস্ট করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশের অনুমতি নিয়ে বের করা ওই মিছিলে পরিকল্পিতভাবে বুলডোজার আনা হয়েছিল এবং প্রকাশ্য দিবালোকে জয়ের উদ্যাপন হিসেবে দোকান ভাঙা হয়েছে। ডেরেক সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, সিআরপিএফ কর্মীদের উপস্থিতিতে কীভাবে এই ধরনের তা-ব চালানো সম্ভব হলো।
এই ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশের অনুমতি নিয়েই এই বিজয় মিছিল বের করা হয়েছিল। সেখান থেকেই সিআরপিএফের উপস্থিতিতে ভাঙা হয় নিউমার্কেটের মাংসের দোকান।
নিয়মের তোয়াক্কা না করে কীভাবে এই ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে পুলিশের তরফে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। ভোটের প্রচারে তৃণমূল বারবার দাবি করেছিল যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির মাছ-মাংস খাওয়ায় কোপ পড়বে। নিউমার্কেটের এই ঘটনার পর সেই পুরনো বিতর্কই এখন শাসকদলের হাতে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে রাজ্য বিজেপির পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছেন, বাঙালি সংস্কৃতিতে মাছ-গোশতের গুরুত্ব তারা বোঝেন এবং কোনো প্রকার হিংসাকেই দল প্রশ্রয় দেবে না। তিনি উল্টো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, তৃণমূলের একটি অংশ বিজেপির পতাকা হাতে নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দলের বদনাম করার চেষ্টা করতে পারে।
এদিকে ব্যস্ত মার্কেটে বিজেপির এমন সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্রী। তিনি লিখেছেন, “কলকাতার ঐতিহাসিক নিউমার্কেট। বাঙালিরা পরিবর্তনের মাঝে আনন্দ করছেন।”
পুলিশের উপস্থিতিতে গোশতের দোকানে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী ডেরেক ও ব্রায়েন। তিনি এক্সে লিখেছেন, “মধ্য কলকাতায়, নিউমার্কেটের কাছে পুলিশের অনুমতি নিয়ে, বিজয় উল্লাসের অংশ হিসেবে, মাংসের দোকান ভাঙার জন্য একটি বুলডোজার নিয়ে আসা হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী চেয়ে চেয়ে দেখেছে। বিজেপির উদ্দেশ্যে আমি বলছি, বিশ্বকে এসব চিত্র দেখতে দিন।”
নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় পশ্চিমবঙ্গে নিহত ৪ : বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া তিন পুলিশ কর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুই সদস্য গুলীবিদ্ধ হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ভোট গণনার পর্ব শেষ হওয়ার পর থেকে রাজ্যজুড়ে সহিংসতায় নিহতের ঘটনা ঘটেই চলছে। ফল প্রকাশের পরেই বিজেপি ও তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হন ৪৫ বছর বয়সী তৃণমূল কর্মী আবির শেখ।
আবিরের আত্মীয় মহসিনা বেগম বেগম জানান, আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন আবির। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার পথেই বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের হামলার শিকার হন তিনি। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরে বিজেপির এক সমর্থককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় যথেষ্ট উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মৃত ব্যক্তির নাম যাদব বর (৪৮)।
যাদবের মৃত্যুর ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছে পরিবার। তাদের দাবি, যাদব বিজেপির সমর্থক ছিলেন। গত সোমবার রাত প্রায় ১১টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে একদল লোক যাদবকে ঘিরে ধরে ও নির্মমভাবে মারধর করে।
গুরুতর আহত অবস্থায় দ্রুত উদয়নারায়ণপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। অভিযুক্তদের খোঁজে অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এদিকে, কলকাতা নিউ টাউনে ‘হত্যার শিকার’ হয়েছেন বিজেপি কর্মী মধু ম-ল। গত মঙ্গলবার বিজেপির বিজয় মিছিলে তৃণমূল কংগ্রেসের অতর্কিত হামলায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবার ও স্বজনদের। মধু ম-লের মাথায় আঘাত লাগে ও আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নাজাত থানার অন্তর্গত সারাবেড়িয়া আগরহাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বামনঝেরি এলাকায় ভোট পরবর্তী উত্তেজনাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গত মঙ্গলবার দিনগত রাতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে ওই এলাকায় টহল দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলী চালায়।
এ ঘটনায় নাজাত থানার পুলিশ ইনচার্জ ভারত পুরোকাইত, রাজবাড়ী ফাড়ির পুলিশ কর্মকর্তা ভাস্কর গোস্বামী ও এক নারী পুলিশ অফিসার গুলীবিদ্ধ হন। পাশাপাশি গুলীবিদ্ধ হন কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুই জওয়ান। রাতেই তাদের উদ্ধার করে মিনাখা পল্লি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পাঁচজনের মধ্যে একজনকে মৃত ঘোষণা করেন। এসব ঘটনায় গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে অঞ্চলজুড়ে।
একাধিক ঘটনায় গ্রেফতার ৮০ জন : ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যজুড়ে যখন বিজয়োৎসবের আবহ, ঠিক সেই সময়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কড়া অবস্থান নিয়েছে কলকাতা পুলিশ। বেশ কিছু অপরাধ ঘটনা ঘটার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গেরুয়া শিবিরের জয়ের উচ্ছ্বাসে বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, আবির-গুলাল ও ঢাকের তালে উদযাপনের ছবি সামনে আসছে। তবে এই উচ্ছ্বাসের মধ্যেই কিছু ক্ষেত্রে বুলডোজার বা জেসিবি নিয়ে মিছিল করার প্রবণতা প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক সম্মেলন করে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ। তিনি জানান, বিজয় মিছিলে কোনোভাবেই জেসিবি বা বুলডোজার ব্যবহার করা যাবে না। নির্দেশ অমান্য করা হলে শুধু মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধেই নয়, সংশ্লিষ্ট যন্ত্রের মালিকদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের পক্ষে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, উৎসব পালন করা যাবে, তবে তা হতে হবে সম্পূর্ণ আইন মেনে এবং নিরাপত্তা বজায় রেখে। ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে রাস্তায় নামা যে কোনো সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে—এই যুক্তিতেই জারি হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞা।
ইতোমধ্যে শহরজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কমিশনার জানান, অনুমতি ছাড়া কোনও মিছিল বা শোভাযাত্রা বরদাস্ত করা হবে না। এমন ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তা আটকানো হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একইসঙ্গে জেসিবি মালিকদেরও সতর্ক করা হয়েছে এ ধরনের মিছিলে যন্ত্র ভাড়ায় দিলে তা বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপও শুরু হবে।নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া অশান্তির ঘটনাকেও গুরুত্ব সহকারে দেখছে প্রশাসন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে একাধিক ঘটনায় প্রায় ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে।