রয়টার্স আল-জাজিরা : বিধানসভা নির্বাচনের আগে চলতি মাসে নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে ভোটার তালিকার হালনাগাদ করেছে। এটি একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়া, যা নিয়ে বিহার, আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত এক ডজনের বেশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর পরিচালনা করেছে।

নবীজানের স্বামী, তিন ছেলে, এক মেয়ে ও তাঁদের স্ত্রী-স্বামীরা সবাই চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেলেও তিনি পাননি। কারণ, এত দিন নবীজান ও তাঁর পরিবার খেয়াল করেনি, ভোটার কার্ডে তাঁর ডাকনাম ‘নবীজান’ ছিল। কিন্তু আধার কার্ড ও রেশন কার্ডের মতো অন্যান্য সরকারি নথিতে তাঁর নাম ‘নবীরুল’। এই এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে নবীজানের মতো ৯২ লাখের বেশি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন, যা রাজ্যের মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এই ৯২ লাখের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ৩০ লাখ ভোটার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাঁদের মামলার শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ভোট দিতে পারবেন না।

বিধানসভা ভোটের আগে এত বিপুলসংখ্যক মামলার শুনানি প্রায় অসম্ভব। এ ছাড়া ভোটাধিকার প্রমাণে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করে ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়া সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন, যাঁদের মামলা ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে, তাঁদের এপ্রিলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আদালত নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের আগে সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশের অনুমতি দিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা নবীজান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এবার আমার পুরো পরিবার ভোট দেবে, কিন্তু আমি পারব না। আমি এসব খুব একটা বুঝি না। জানতাম না যে নামে ভুল থাকলে ভোট দেওয়া যাবে না।’

‘আমি গভীর যন্ত্রণায় আছি’: ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মুসলিম বাস করেন, যা রাজ্যের মোট ১০ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। উত্তর প্রদেশের পর পশ্চিমবঙ্গেই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে।

বিজেপি এই রাজ্যে কখনো ক্ষমতায় আসতে পারেনি। টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ক্ষমতায় আসে। তখন থেকে তারা রাজ্য শাসন করছে। ৭১ বছর বয়সী মমতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। সবর ইনস্টিটিউট দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করেছে। নন্দীগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও বাদ পড়া নামের ৯৫ শতাংশই মুসলিম। একইভাবে ভবানীপুরে ২০ শতাংশ মুসলিম থাকলেও বাদ পড়াদের ৪০ শতাংশই মুসলিম।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমরা এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি এবং যারা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানেই নাম কাটার হার বেশি। যেমন মুর্শিদাবাদে ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর চব্বিশ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদহে ২ লাখ ৪০ হাজার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবিন্দপুর, গোবরা ও বালকি গ্রামের ডজনখানেক মুসলিম পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, সব নথি ঠিক থাকা সত্ত্বেও অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে বাসস্থানের প্রমাণ, বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন, নামের বানানে ভুল বা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরের প্রমাণ দেখাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নবীজানের মতো মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া গ্রামের ৪৯ বছর বয়সী সহিদুল ইসলামও আগে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি আর ভোটার নন। সহিদুল বলেন, ‘আমি গভীর যন্ত্রণায় আছি। কার কাছে যাব? কখনো ভাবিনি তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে। এখন আমার প্রধান লক্ষ্য নাম আবার অন্তর্ভুক্ত করা। টাকা আর সময় নষ্ট হলেও আমাকে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।’

নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, এসআইআর প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ভুয়া বা মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং বাদ পড়া প্রকৃত ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ব্যাপক বিতর্ক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিরোধী দল ও মুসলিম সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, যারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপিকে ভোট দেবে না, বিশেষ করে মুসলিমদের পরিকল্পিতভাবে তালিকা থেকে বাদ দিতে এই কাজ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা বিমল শঙ্কর নন্দ আল-জাজিরাকে বলেন, কোনো যোগ্য ভারতীয় নাগরিক যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, তবে অযোগ্য ভোটারও তালিকায় থাকা উচিত নয়। তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘মৃত ও এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ভোটারদের’ নাম তালিকায় রাখার অভিযোগ তোলেন। তিনি আরও দাবি করেন, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পরিকল্পিতভাবে বদলে দেওয়া হচ্ছে।