আল-মনিটর : ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিগত ১২ মাসে ইরান এমন কিছু পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, যা যেকোনও রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একের পর এক বড় হামলা, নিষেধাজ্ঞা, বিক্ষোভ সামলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা কীভাবে টিকে আছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে বিভিন্ন বিশ্লেষণ। পর্যবেক্ষকদের মতে, কেবল রাষ্ট্রীয় শক্তি নয়, বরং দেশটির গভীরে ছড়িয়ে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কই একে পতনের হাত থেকে রক্ষা করছে।
এক বছরে তিন বড় আঘাত
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ড প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বছরের শেষ দিকে দেশটিতে শুরু হয় বিপ্লব-পরবর্তী সবচেয়ে বড় গণ-অভ্যুত্থান। ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএনার মতে ৬ হাজার এবং সরকারি হিসেবে ৩ হাজার ১১৮ জন নিহত হন।
সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। এক হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তার পরিবারসহ নিহত হন। একই সঙ্গে আলী লারিজানির মতো প্রভাবশালী রাজনীতিক এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা প্রাণ হারান।
কীভাবে সামলে নিলো ইরান?
খামেনির মৃত্যুর ১০ দিনের মাথায় উত্তরসূরি নির্বাচন করা হয়। অবাক করার মতো বিষয় হলো, চরম উত্তেজনার মধ্যেও দেশটির জনসেবা বা প্রশাসনিক কাজ সচল ছিল। তেহরান, ইস্পাহান ও মাশহাদের রাস্তায় সরকারপন্থিদের বিশাল বিশাল সমাবেশ দেখা গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, খামেনি আগেই একটি উত্তরাধিকার পরিকল্পনা করে গিয়েছিলেন, যাতে শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকলেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।
দলহীন ব্যবস্থায় ক্ষমতার উৎস
ইরানে ১৯৮৭ সালের পর থেকে কোনও কার্যকর শাসক দল নেই। ২০০টির বেশি নিবন্ধিত দল থাকলেও সেগুলো মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরদারির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে দল না থাকলেও নির্বাচনি রাজনীতি সচল। ২০২৬ সালের সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার প্রার্থী অংশ নেন। গবেষকদের মতে, ইরানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নয়, বরং সেই নেটওয়ার্কগুলোর ওপর নির্ভর করে যারা এই প্রার্থীদের জোগান দেয়।
যে ৪টি স্তম্ভে টিকে আছে ব্যবস্থা
ধর্মীয় নেটওয়ার্ক (হেইয়াত): ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কাঠামো হলো পাড়া-মহল্লাভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন বা ‘হেইয়াত’। দেশটিতে অন্তত ৯০ হাজার হেইয়াত এবং ৬০ হাজার ‘মাদ্দাহ’ (ধর্মীয় নেতা) রয়েছেন। খামেনির মৃত্যুর পর সরকারি ঘোষণার আগেই এই নেটওয়ার্কগুলো শোক সভা ও নতুন সর্বোচ্চ নেতার বার্তা প্রচার করে সাধারণ মানুষকে সংবদ্ধ করে ফেলে।
উপজাতীয় ও পারিবারিক প্রভাব: খুজিস্তান বা সিস্তান-বেলুচিস্তানের মতো প্রদেশগুলোতে উপজাতীয় প্রধানরা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। অবকাঠামো উন্নয়ন বা বিরোধ মীমাংসায় তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাজার ও বণিক সমিতি: তেহরান ও তাবরিজের বড় বাজারগুলোর ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। লাইসেন্স ও ঋণের বিনিময়ে তারা সরকারকে সমর্থন জোগায়।
ঠিকাদারি ব্যবস্থা: ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর গড়ে ওঠা মাঝারি ও ক্ষুদ্র ঠিকাদাররা স্থানীয় এমপিদের নির্বাচনি তহবিল ও জনবল জোগান দেয়। উন্নয়ন বাজেটের বিনিময়ে তারা তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সংহতি বজায় রাখে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিমান হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতাকে নির্মূল করা সম্ভব হলেও হাজার হাজার ধর্মীয় গোষ্ঠী, উপজাতীয় কাউন্সিল বা বাজার সমিতিকে ধ্বংস করা অসম্ভব। নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও এই অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কগুলো অনেকটা সুরক্ষিত। তবে ইরানের মূল ক্ষয় শুরু হয়েছে ভেতর থেকে। সমষ্টিগত ধর্মীয় চর্চায় ভাটা, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব এবং সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে বাস্তব জীবনের অমিলই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই ক্ষয়িষ্ণু প্রক্রিয়া কোনও বিমান হামলার চেয়েও ধীরগতির, কিন্তু ব্যবস্থার আসল ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিতে এটিই সবচেয়ে বড় হুমকি।