এপি : ইরানের শাসনব্যবস্থাকে নতিস্বীকার করাতে পাঁচ সপ্তাহ ধরে টানা হামলা চালিয়েও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই পরিস্থিতিতে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতের মধ্যে তাঁর কাছে ‘গ্রহণযোগ্য’ কোনও প্রস্তাব না এলে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও সব সেতু পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা শুরু করবে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের আগামীকাল ইস্টার্ন টাইম রাত ৮টা পর্যন্ত সময় দিচ্ছি। এরপর তাদের কোনও সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র অবশিষ্ট থাকবে না। আমি পূর্ণ ধ্বংসলীলার কথা বলছি। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে।’

ট্রাম্পের এই হুমকিকে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনকারী হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়া বা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর কোনও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বেসামরিক অবকাঠামোতে এমন বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা আর দেখা যায়নি। তবে এই কৌশলে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ হবে কি না, তা নিয়ে খোদ পেন্টাগনের ভেতরেই সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে ইস্পাহানে এখনও প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ভূগর্ভস্থ অবস্থায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, কুর্দি গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরানি বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দিয়ে সরকার পতনের একটি গোপন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের শুরুতে ইরানের তেল সম্পদ অক্ষত রাখার যে নীতি মার্কিন পরিকল্পনাকারীরা নিয়েছিলেন, ট্রাম্পের নতুন হুমকিতে সেই অবস্থানও এখন নড়বড়ে। সোমবারের পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে আসালুয়েহ এলাকায় ইরানের বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন কেন্দ্রে ইসরায়েলি বিমান হামলায়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, এই হামলা ইরানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর বড় আঘাত। তবে ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম ও ফার্স নিউজ জানিয়েছে, মূল স্থাপনা অক্ষত থাকলেও আশপাশের বিদ্যুৎ, পানি ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

ট্রাম্পের শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে কালো মেঘের ছায়া ফেলছে। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, বোমা মেরে ইরানকে বিধ্বস্ত করা গেলেও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কঠিন। তিনি বলেন, ‘সব ধ্বংস করার পরও একজন সন্ত্রাসী যদি ট্রাক বোঝাই মাইন নিয়ে পানিতে ছেড়ে দেয়, তবেই সব বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’ এদিকে ইরান বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ফি আদায় করছে, যাকে তারা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে অভিহিত করছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রবার্ট পেপ যুক্তি দিয়েছেন, বেসামরিক অবকাঠামোতে বোমা বর্ষণ সাধারণত জনগণের মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয়, যদি না সেখানে বড় ধরনের স্থল অভিযানের বিশ্বাসযোগ্য হুমকি থাকে। পেন্টাগন সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। গত সপ্তাহে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে এবং আরও ২ হাজার ২০০ মেরিন সেনা পথে রয়েছে। এ ছাড়া ৮২তম এয়ারবর্ন ব্রিগেডের একটি দলও অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। গত সপ্তাহে একজন নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধারের জন্য শত শত মার্কিন সেনা ইরানের অভ্যন্তরে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে বলে সোমবার নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। আপাতত ট্রাম্প কূটনীতির চেয়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকেই বেছে নিয়েছেন। ইরানের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সোমবার বলেন, ‘আমি শুধু এইটুকুই বলতে পারি, তারা চায় আমরা বোমা ফেলা অব্যাহত রাখি।’