- মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ২২৮টি স্থাপনা ধ্বংস ইরানে
- মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত সুইজারল্যান্ড
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর এখন মুখ রক্ষার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ জন্য ইরানের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতার পথ খুঁজছেন, যাতে মার্কিন জনগণের কাছে তার ‘সম্মান রক্ষা’ হয়- এমন মন্তব্য করেছেন তেহরানভিত্তিক এক বিশ্লেষক। আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স, সিএনএন, বিবিসি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস : এএনআই, এনডিটিভি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তাৎক্ষণিক কোনও সমঝোতার লক্ষণ তিনি দেখছেন না।
তার ভাষায়, “চীন সফরে যাওয়ার আগে ট্রাম্প কিছু একটা অর্জন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টায় তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।”
দারেইনি আরও বলেন, “ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলপন্থী লবির পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে এমন একটি ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে, ইরানের ওপর হামলা চালালে তেহরান পিছু হটবে এবং আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ইরান নতি স্বীকার করেনি এবং লাখো বছরেও করবে না।”
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল রফতানির এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনও ধরনের সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং নৌ-অভিযান পরিচালনার পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানের কঠোর অবস্থান এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অন্যদিকে তেহরান বারবার দাবি করে আসছে, তারা কোনও চাপ বা সামরিক হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা ‘সব ধরনের পদক্ষেপ’ নিতে প্রস্তুত।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই সংকট কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোবে নাকি আরও বড় সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে-এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
মার্কিন বিমানকে নিজ আকাশসীমা ব্যবহারের ‘অনুমতি দেয়নি’ সৌদি আরব ও কুয়েত
সৌদি আরব ও কুয়েত তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাহারার পরিকল্পিত নৌ-অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ব্যবহার কিংবা সৌদি আরবের আকাশসীমা দিয়ে মার্কিন বিমান ওড়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সৌদি আরব।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, গত রোববার ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণার সিদ্ধান্তে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেও ওই বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ‘সমস্যা হলো, সবকিছু খুব দ্রুত ঘটছে।’ তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সৌদি আরব সমর্থন করছে।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, আঞ্চলিক মিত্রদের আগে থেকেই এ অভিযান সম্পর্কে জানানো হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের একজন কূটনীতিক জানান, ট্রাম্পের প্রকাশ্য ঘোষণার পর শুধু ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এই কূটনীতিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আগে ঘোষণা দিয়েছে, পরে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। তবে এতে আমরা ক্ষুব্ধ নই।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আকস্মিক ঘোষণা সৌদি আরবের নেতৃত্বকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। এর পরপরই দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয় যে, তারা এ পরিকল্পনায় সমর্থন দেবে না।
ইতিমধ্যে, মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, সৌদি আরবের পাশাপাশি কুয়েতও তাদের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও আকাশসীমা ওই অভিযানে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করার এক দিন পরই ইরানও এ ইস্যুতে তাদের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে। ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা বৃহস্পতিবার জানায়, হরমুজ প্রণালি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তারা কারিগরি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
ইরান জানিয়েছে, তাদের জলসীমার কাছে থাকা জাহাজগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা নিতে পারবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত সুইজারল্যান্ড
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবারও নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানালো সুইজারল্যান্ড। আজ জেনেভায় রুশ সংবাদ সংস্থা তাস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই আগ্রহের কথা জানান সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেলানি গুগেলম্যান।
তিনি বলেন, সুইজারল্যান্ড সবসময়ই তার মধ্যস্থতার সেবা প্রদানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে জেনেভা এই আলোচনার সম্ভাব্য ভেন্যু হতে পারে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে জানান, শান্তি স্থাপনে সহায়ক যেকোনো কূটনৈতিক উদ্যোগকে সমর্থন করতে তার দেশ বদ্ধপরিকর।
মুখপাত্র আরও উল্লেখ করেন, এই সংকট সমাধানে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, ওয়াশিংটন এবং তেহরান সশস্ত্র সংঘাত অবসানে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছিল, এই চুক্তির খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে খুব শীঘ্রই ইসলামাদ অথবা জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। সুইজারল্যান্ডের এই ঘোষণা সেই গুঞ্জনকে আরও জোরালো করলো এবং আন্তর্জাতিক মহলে পুনরায় শান্তি ফেরার নতুন আশা জাগিয়েছে।
মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ২২৮টি স্থাপনা ধ্বংস ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর অন্তত ২২৮টি প্রতিরক্ষা স্থাপনা বা সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে। মূলত ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইরান মার্কিন ঘাঁটির হ্যাঙ্গার, ব্যারাক, জ্বালানি ডিপো, সামরিক বিমান এবং গুরুত্বপূর্ণ রাডার, যোগাযোগ ও বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে আঘাত হেনেছে। এই সময়ে ইরান অনেকগুলো সফল বিমান হামলাও চালিয়েছিল।
ওয়াশিংটন পোস্টের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর আগে প্রকাশিত তথ্যের তুলনায় মার্কিন সামরিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সেন্টকম অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সম্পদের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেসি-১৩৫ স্টার্টোট্যাঙ্কার বিমান হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ার সময় রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রায় ৪০ থেকে ৫২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বিমানটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ হিসেবে পরিচিত। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি ফ্লাইটরাডার২৪–এর তথ্য উদ্ধৃত করে বিমানটির নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ জানিয়েছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন একই ধরনের এক প্রতিবেদনে এই অঞ্চলের অন্তত ১৬টি মার্কিন ঘাঁটিতে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির’ কথা জানিয়েছিল। যা শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র অস্বিকার করে আসছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টিডব্লিউজেডের অভ্যন্তরীণ তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৩৯টি সামরিক বিমান হারিয়েছে, যার মধ্যে চারটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান রয়েছে। এছাড়া আরও ১০টি বিমান বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখছে, কর্মকর্তাদের মতে বিমান হামলার হুমকি ‘অঞ্চলের কিছু মার্কিন ঘাঁটিকে স্বাভাবিকভাবে সেনা মোতায়েনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে এবং কমান্ডাররা যুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই তাদের বাহিনীর একটি বড় অংশকে ইরানি হামলার আওতার বাইরে সরিয়ে নিয়েছেন।
তবে এক সামরিক মুখপাত্র ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ‘বিশেষজ্ঞদের বর্ণনাকে ব্যাপক ধ্বংস বা ব্যর্থতার লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।’ কারণ ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ জটিল এবং কিছু ক্ষেত্রে ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। সামরিক মুখপাত্র ওয়াশিংটন পোস্টকে আরও বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে সামরিক কমান্ডাররা ইরানের হামলা সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র দিতে পারবেন। গত সপ্তাহে মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যয় হবে ২৫ বিলিয়ন বা ২৫০০ কোটি ডলার। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন এই যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম পুনরায় সংগ্রহ করতে মাস বা বছর লেগে যেতে পারে। এদিকে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর পেন্টাগন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কাছে ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজেট চেয়েছে। যা আগের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এসব কিছুই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ব্যাপক প্রভাবিত করেছে।