পঞ্চাশ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে রাজত্ব করা আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অস্ত্রটি এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। খোদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ওয়াশিংটনের এই মরণাস্ত্রটি অকেজো হয়ে যেতে পারে। কেনেথ রোগফের নতুন বই 'আওয়ার ডলার, ইয়োর প্রবলেম'-এ বর্ণিত সেই দম্ভ আজ ফিকে হতে শুরু করেছে। মূলত দক্ষতা আর ভাগ্যের মেলবন্ধনে যে আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই দেয়ালে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে।
১৯৭৪ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের করা সেই ঐতিহাসিক চুক্তি ছিল ডলারের রক্ষাকবচ। সৌদি আরব তাদের তেল ডলারে বিক্রি করতে রাজি হয়েছিল এবং সেই উদ্বৃত্ত অর্থ আবার মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হতো। এই চক্রাকার ব্যবস্থার কারণেই বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। এই ব্যবস্থার ওপর ভর করেই ওয়াশিংটন তার শত্রুদের আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে একঘরে করে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছিল। কিন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করার পর বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে তাদের সঞ্চিত ডলার আসলে নিরাপদ কোনো আমানত নয় বরং মার্কিন জিম্মায় থাকা বন্দি সম্পদ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে। এক সময় আমেরিকা ছিল সৌদি তেলের প্রধান ক্রেতা কিন্তু এখন সৌদি আরব তাদের উৎপাদিত তেলের বড় অংশই এশিয়ার বাজারে, বিশেষ করে চীনে রপ্তানি করে। ফলে আমেরিকার সেই অপরিহার্য ক্রেতার মর্যাদা আর নেই। এরই মধ্যে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে মিলে 'প্রজেক্ট এম-ব্রিজ' নামক একটি ব্লকচেইন ভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা ডলার কিংবা সুইফট নেটওয়ার্ক ছাড়াই ডিজিটাল মুদ্রায় লেনদেন করতে সক্ষম হচ্ছে।
ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এই পরিস্থিতির অবনতিকে ত্বরান্বিত করেছে। এই যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় শুধু বিপুল অর্থেই সীমাবদ্ধ নয় এটি তেলের বাজারের স্থিতিশীলতাকেও চুরমার করে দিয়েছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির হাত থেকে নিজেদের মুদ্রা বাঁচাতে ভারত, থাইল্যান্ড এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো তাদের কাছে থাকা মার্কিন বন্ড বিক্রি করতে শুরু করেছে। দীর্ঘ এক দশকের মধ্যে এই প্রথম দেখা যাচ্ছে যে, সংকটের সময়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলারের দিকে না ঝুঁকে উল্টো তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো তেল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় এবং কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে ডলারের প্রবাহ কমে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন বন্ডের চেয়ে সোনার মজুত বাড়ানোকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এমনকি ইরান এখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে টোল আদায় করছে। এটি ডলারে প্রচলিত একক আধিপত্যের ওপর এক সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলারের ভবিষ্যৎ কেবল অন্য কোনো মুদ্রার কাছে হেরে যাওয়ার ওপর নির্ভর করছে না। বিশ্ব এখন জ্বালানি ব্যবহারের ধরণ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছে। চীন বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ সৌর প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন তৈরি করছে, যার ফলে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমছে। যদি বিশ্ববাজার তেল নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তবে পেট্রোডলারের গুরুত্ব এমনিতেই সংকুচিত হয়ে আসবে। জ্বালানি শক্তির এই রূপান্তর ডলারের প্রাসঙ্গিকতাকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
চমকপ্রদ মন্তব্যটি এসেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছ থেকে। তিনি ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে ব্রাজিল এবং চীনের মতো দেশগুলো এখন নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য করছে। তারা ডলারের সমান্তরালে একটি স্বতন্ত্র অর্থনীতি গড়ে তুলছে যা ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। রুবিওর মতে, পাঁচ বছর পর আমেরিকার হাতে আর এমন কোনো শক্তি থাকবে না যা দিয়ে তারা অন্য দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, কারণ তখন দেশগুলোর কাছে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা হাতের নাগালে থাকবে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে কোনো মুদ্রার একাধিপত্য চিরস্থায়ী হয় না। রোমান সাম্রাজ্যের 'দিনারিয়াস' মুদ্রাও এক সময় বিলীন হয়ে গিয়েছিল যখন শাসকরা যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এর মান কমিয়ে দিয়েছিলেন। আজ ডলার হয়তো একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না, কিন্তু এর প্রশ্নহীন শ্রেষ্ঠত্বের যুগ যে সমাপ্তির পথে তা এখন স্পষ্ট।