২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এসে বিশ্ব এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শান্তির লেশমাত্র কোথাও নেই। বরং এই ‘শান্তি’ এখন এক বড় ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। একদিকে চলছে আলোচনার তোড়জোড়, অন্যদিকে লেবাননের আকাশ ছেয়ে আছে কালো ধোঁয়ায় আর বিশ্ব অর্থনীতি থমকে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের সংকটে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইতোমধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ইতোমধ্য ইরান জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানে কোনো শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে না।

গত মঙ্গলবার ইরানের ১০ দফা শর্তকে আলোচনার টেবিলে এনে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। যেখানে অন্যতম শর্ত ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলগুলিতে নতুন করে আগ্রাসন চালাবে না আমেরিকা বা ইজরায়েল। তবে যুদ্ধবিরতির শর্ত থেকে সেই প্রস্তাব খারিজ করে বুধবার লেবাননে ভয়ংকর হামলা চালায় ইজরায়েল; যা ছিল এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো বৈরুত কেঁপে ওঠে। আকাশ ঢেকে যায় ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে। কেবল বৈরুত নয়, বেকা উপত্যকা, দক্ষিণ লেবাননজুড়ে হেজবোল্লার ১০০টিরও বেশি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তেল আভিভ। লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, এই হামলায় সব মিলিয়ে ২৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছেন। পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরও ১১৬৫ জন। পরের দিন বৃহস্পতিবারও এই হামলা অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ, আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বা উত্তেজনা কমাতে চাচ্ছে, ইসরায়েল তখন উল্টো পথে হেঁটে ইরানকে সরাসরি যুদ্ধের মাঠে টেনে আনার চেষ্টা করছে।

ইসলামাবাদে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি হয়েছে, সেটি মূলত এক চরম উত্তেজনার মুহূর্তে নেওয়া সাময়িক পদক্ষেপ। আমেরিকার পক্ষ থেকে ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার হুমকির মুখে এই দুই সপ্তাহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু এই চুক্তির ভিত্তি শুরু থেকেই নড়বড়ে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই চুক্তিতে আঞ্চলিক অন্যান্য পক্ষগুলোর অবস্থান স্পষ্ট নয়। ইসরায়েল লেবাননের বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একদিনেই প্রাণ হারিয়েছে দুই শতাধিক মানুষ। ফলে এই দুই সপ্তাহের বিরতি শান্তির সেতুবন্ধন না হয়ে বরং এক ভয়ংকর সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষণগণনায় পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কারণ হরমুজ প্রণালী সচল না থাকলে কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতির চাকা অচল হয়ে পড়বে। এই জলপথটি এখন কেবল একটি বাণিজ্যপথ নয়, বরং ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে যাচ্ছেন। ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব এবং আমেরিকার পাল্টা শর্তগুলোর মধ্যে কোনো সাধারণ ঐক্যমত্য হবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে সংশয় রয়েছে।

আগামী ১৪ দিন নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য কি এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটে তলিয়ে যাবে নাকি কোনো টেকসই সমাধান আসবে। যদি ইসলামাবাদ বৈঠক লেবানন ইস্যু বা হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শান্তির সূচনা হিসেবে নয়, বরং এক মহাপ্রলয়ের আগের স্তব্ধতা হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা—বিশ্ব কি যুদ্ধের আগুনে পুড়বে নাকি আলোচনার টেবিলে মিলবে মুক্তি?

ইসরায়েলের রহস্যময় বা দ্বিমুখী অবস্থান বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। কাগজে-কলমে শান্তিকালীন সময় চললেও বাস্তবে লেবানন বা গাজায় বোমা বর্ষণ থামছে না। এটি আন্তর্জাতিক মহলে এই প্রশ্ন তুলছে যে, প্রধান মিত্রদের মধ্যকার চুক্তিকে কি তবে ইসরায়েল বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব বর্তমানে যুদ্ধের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। ইসরায়েলের ভেতরে অতি-ডানপন্থী দলগুলোর চাপ রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক চাপে পড়লে তিনি সাময়িকভাবে নমনীয় হওয়ার ভান করলেও, মাঠ পর্যায়ে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আক্রমণাত্মক ভূমিকা কি কেবল নিরাপত্তার জন্য, নাকি নিজের গদি টিকিয়ে রাখার জন্য—তা নিয়ে খোদ ইসরায়েলের অভ্যন্তরেই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল হয়তো চাচ্ছে ইরানকে এমনভাবে উসকে দিতে যাতে তেহরান বাধ্য হয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে। যদি লেবাননে হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান সরাসরি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, তবে আমেরিকা আবার সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ, আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বা উত্তেজনা কমাতে চাচ্ছে, ইসরায়েল তখন উল্টো পথে হেঁটে ইরানকে সরাসরি যুদ্ধের মাঠে টেনে আনার চেষ্টা করছে।

এদিকে ইসরায়েলের এই ভূমিকা ওয়াশিংটনকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। একদিকে বাইডেন বা ট্রাম্প প্রশাসন (রাজনৈতিক পটভূমি অনুযায়ী) মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়, অন্যদিকে ইসরায়েল তাদের দেওয়া ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ বা নিঃশর্ত সমর্থন ব্যবহার করে একতরফা সামরিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, ইসরায়েল কি এখন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, নাকি এটি পর্দার আড়ালের কোনো সাজানো নাটক?

ইসরায়েলের এই প্রশ্নবোধক ভূমিকা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি কেবল দুই শক্তির (আমেরিকা ও ইরান) সই করা কাগজের ওপর নির্ভর করে না। ইসরায়েলের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুদ্ধবিরতিকে ঠুনকো অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে বার বার।

ডিএস/এমএএইচ