মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রের দিকে তাকালে ইদানীং একটা তীব্র অস্থিরতা চোখ এড়ায় না। প্রতিদিনের খবরের কাগজে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন আর মানবিক বিপর্যয়ের যে ছবি আমরা দেখছি, তার গভীরে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘমেয়াদি ও বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক চাল। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে এখন একটি বিষয়ে জোরালো আলোচনা চলছে—ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট বৃহত্তর উত্তেজনার আড়ালে ইসরায়েল আসলে লেবানন ও ফিলিস্তিনে তার ভূখণ্ডগত ও ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ করতে চাইছে। বিশ্বমঞ্চের মনোযোগ যখন ইরান বা পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক দরকষাকষিতে নিবদ্ধ থাকে, তেল আবিব তখন মাঠের ভেতরের সামরিক ও কৌশলগত বাস্তবতাটাই চিরতরে বদলে ফেলার তাড়াহুড়োয় আছে।
‘ইরান কার্ড’ ও ইসরায়েলের কৌশলগত টাইমিং
এই পুরো সমীকরণটি বুঝতে হলে আমাদের ইসরায়েলের ‘টাইমিং’ বা সময়ের গুরুত্ব বুঝতে হবে। ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই জানেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আজীবন এক থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে লেবাননে ছয় সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেই আশার আলো এখন অনেকটাই অকার্যকর ও নিস্প্রভ। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান ও বিমান হামলা নতুন করে জোরদার করেছে। এমনকি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গসহ বিভিন্ন এলাকা ইতিমধ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তারা।
এখানেই স্পষ্ট হয় ইসরায়েলের মূল চাল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা ক্রমান্বয়েই অনিশ্চয়তার দিকে চলে যাচ্ছে—যেখানে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো শান্তি চুক্তিতে যাবে না। আর ঠিক এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ইরান সংকটের আড়ালকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবানন ও ফিলিস্তিনে তাদের সামরিক কার্যক্রম তীব্রভাবে সম্প্রসারিত করছে।
লেবানন ফ্রন্ট: লিটানি পেরিয়ে জাহারানির ছক
লেবাননে ইসরায়েলের বর্তমান সামরিক অভিযানের গভীরতা ও পরিধি কেবল সীমান্ত সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এক বড় ধরনের ভূখণ্ডগত আগ্রাসনের রূপ নিয়েছে।
অভিযানের বিস্তার: ইসরায়েলি বাহিনী তাদের স্থল অভিযান প্রসারিত করে লিটানি নদী এবং জাহারানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আগ্রাসন চালিয়েছে। বৈরুতের দাহিয়া, বেকা উপত্যকা এবং লিটানি নদীর সংযোগকারী সেতুগুলোতে চালানো হয়েছে তীব্র বিমান হামলা।
নেতানিয়াহুর নতুন নির্দেশ: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু লেবাননে সামরিক অভিযান লিটানি নদী থেকে আরও উত্তরে জাহারানি নদীর দিকে সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, ইসরায়েল কেবল বাফার জোন চাইছে না, বরং লেবাননের একটি বিশাল অংশকে স্থায়ীভাবে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছে।
জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের তথ্য মতে, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স ও বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোগুলো নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছে। এই তীব্র যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যে ১০ লাখেরও বেশি লেবানিজ নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং পুরো দক্ষিণ লেবানন জুড়ে ব্যাপক ও স্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
ফিলিস্তিন ফ্রন্ট: দুই অঞ্চলেই অবিরাম তাণ্ডব
লেবাননের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সমান্তরালে গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলের তাণ্ডব সমানে অব্যাহত রয়েছে।
গাজায় অবিরাম হামলা: তথাকথিত যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেও গাজার মধ্যাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত অভিযান ও সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। গাজাকে কার্যত একটি অবাসযোগ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে এর ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই এখন মূল লক্ষ্য।
পশ্চিম তীরকে নীরবে গ্রাস:অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও কথিত 'সন্ত্রাসী' সন্দেহে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিশ্ববাসীর নজর যখন লেবানন বা ইরানের দিকে, তখন পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে স্থায়ী আধিপত্য বিস্তারের কাজ সারছে আইডিএফ।
কূটনৈতিক শূন্যতা ও সুযোগের সদ্ব্যবহার
দুই অঞ্চলেই সংঘাত অব্যাহত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানামুখী যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতি ও পরিবর্তন ঘটছে। ইসরায়েলি নেতৃত্ব এই ‘কূটনৈতিক শূন্যতা’ বা সুযোগের জানলাটিকে পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে। তারা জানে, পরাশক্তিগুলো যখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বা আঞ্চলিক যুদ্ধ ঠেকানোর বড় সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত থাকবে, সেই ফাঁকে ফিলিস্তিন ও লেবানন সীমান্তে নতুন সীমানা ও সামরিক বাস্তবতা চূড়ান্ত করে ফেলা সম্ভব। একবার তা হয়ে গেলে, ভবিষ্যতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মার্কিন প্রশাসন যা-ই আলোচনা করুক না কেন, ইসরায়েলকে তার দখল করা নতুন কৌশলগত অবস্থান থেকে সরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শেষ কথা
ইতিহাস সাক্ষী, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটগুলো কখনোই শুধু আকস্মিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি একটি সুদূরপ্রসারী ও নির্মম দাবা খেলা। ইসরায়েল এখন সেই চালটিই খেলছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানো বা ইরান সংকটের স্থায়ী সমাধান খোঁজার আগেই তারা লেবানন ও ফিলিস্তিনে নিজেদের ভৌগোলিক আধিপত্য স্থায়ী ও চূড়ান্ত রূপ দিতে চায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ১০ লাখের বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে, হাসপাতাল-বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে এবং জোরপূর্বক সীমানা পরিবর্তন করে চাপিয়ে দেওয়া এই আধিপত্য কি আসলেই কোনো রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা এনে দিতে পারে? নাকি বিশ্বমঞ্চের এই উদাসীনতা মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক চিরস্থায়ী আগ্নেয়গিরির জন্ম দিচ্ছে, যার লাভা একদিন পুরো বৈশ্বিক রাজনীতিকে গ্রাস করবে?