• গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল কিস্তিতে পরিশোধ করতে চায় বিকেএমইএ
  • তৈরি পোশাক খাতে ক্ষতি প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার
  • সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ চালু

গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে দুর্ভোগের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতি বেড়েই চলছে। নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে লোকসানে পড়েছে শিল্প মালিকরা। চলমান গ্যাস সংকটে সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তৈরি পোশাক খাতে ইতোমধ্যে ক্ষতি হয়ে গেছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী টাকায় সে পরিমান দাড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, আবার অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধের পথে। রপ্তানি কার্যাদেশ পূরণ নিয়ে চিন্তিত উদ্যোক্তারা। বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা।

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গতকাল শনিবার এক কর্মশালায় বলেছেন, জ্বালানি সংকটের চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবকাঠামো তৈরি করে এ থেকে বের হওয়ার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন সেই সময় দিতে হবে। জ্বালানি টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নতুন কূপ খনন হলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়বে। সেক্ষেত্রে দুই বছর সময় দরকার।

এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি শুধু নাগরিক জীবনের দুর্ভোগ নয়, অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা হারাচ্ছেন কর্মঘণ্টা ও আয়। কৃষিতে বিদ্যুৎচালিত সেচ ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে ডিজেলনির্ভরতা। মাছ, পোল্ট্রি ও খাদ্য সংরক্ষণেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি। বিদ্যুৎনির্ভর এসব সেক্টরের উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে গড়ে অর্ধেকেরও বেশি। থেমে থেমে ঘুরছে শিল্পকারখানার চাকা।

দুই মাসের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল কিস্তিতে পরিশোধ করতে চায় বিকেএমইএ

শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। ফলে তাদের জন্য জুলাই ও আগস্ট মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ওই দুই মাসের বিল আগামী ১২ মাসে সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ দাবি জানিয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়, জুলাই ও আগস্ট মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের মারাত্মক সংকটের কারণে দেশের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। খোলা ও ক্যাসকেড সিলিন্ডারের মাধ্যমে শিল্পকারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন করতে পারেনি।

উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কারখানা মালিকদের অতিরিক্ত নগদ অর্থ ব্যয়ে ডিজেল, এলপিজি ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে। এসব ব্যয় তাদের পূর্বনির্ধারিত উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে ছিল না। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিকেএমইএ।

সংগঠনটি বলছে, এ পরিস্থিতিতে জুলাই ও আগস্ট মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধ করা অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হবে। এতে রপ্তানি কার্যক্রম, কারখানার উৎপাদন এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষার স্বার্থে জুলাই ও আগস্ট মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছে বিকেএমইএ।

এদিকে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, জ্বালানি-ঘাটতির কারণে শিল্প খাত গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।

শিল্পে থমকে যাচ্ছে উৎপাদন

তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইস্পাত, সিরামিক, প্লাস্টিক, কাগজ, ওষুধ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু মেশিন বন্ধ হয় না, ব্যাহত হয় উৎপাদন প্রক্রিয়া। বিদ্যুৎ ফিরে এলেও মেশিন পুনরায় চালু করতে সময় লাগে। ফলে সরাসরি উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়।

শিল্প-উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ৫ হাজারের বেশি শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে। এতে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন মালিকরা। টঙ্গী, জয়দেবপুর, কোনাবাড়ী, কাশিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। কিছু এলাকায় দৈনিক গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবরও মিলেছে।

পোশাক কারখানাগুলোতে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে দাবি করেছেন উদ্যোক্তারা। তৈরি পোশাক খাতের ক্ষতি সরাসরি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, লোডশেডিংয়ে কারখানাগুলোতে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না; কোনো কোনো এলাকায় তা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টাতেও পৌঁছাচ্ছে। অনেক কারখানা বর্তমানে সক্ষমতার মাত্র ৫০-৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

ইস্পাত শিল্প

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) জানিয়েছে, দেশের ইস্পাতের বার্ষিক চাহিদা কমে ৪০-৫০ লাখ টনে নেমেছে। বিপরীতে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন। বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। লোডশেডিংয়ে দেশের অন্যতম বড় উৎপাদনশীল খাত ইস্পাত শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

টেক্সটাইল-প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্প

গ্যাস বিদ্যুতের সংকটে বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্প। উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে অনেক কারখানার। কোথাও ৩০-৪০ শতাংশ, আবার কোথাও মাত্র ২০-৩০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে উৎপাদন।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং চলতি মূলধনের ঘাটতির কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০টি প্লাস্টিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে অনেক প্লাস্টিক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে চলছে।

বাংলাদেশ সিরামিক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিসিএমইএ) সহসভাপতি রশীদ ময়মুনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অনেক কারখানাই প্রয়োজনের তুলনায় কম গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছে। অনেক কারখানা মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।

দেশের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ২৩ বিলিয়ন ডলারের বস্ত্র শিল্প এখন একের পর এক সংকটে বিপর্যস্ত। বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের মতে, লাভজনক ও টেকসইভাবে পরিচালনার জন্য একটি বস্ত্রকলকে প্রায় ৯৫ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকটে কারখানাগুলোর সক্ষমতার ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৩০ শতাংশ।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ধাক্কা বেশি

বড় কারখানার তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পরিস্থিতি আরও কঠিন। বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন সরাসরি বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামীণ এলাকায় পাওয়ারলুম, মেশিনারি ওয়ার্কশপ, ফার্নিচার, প্রিন্টিং, বেকারি, ছোট খাদ্য কারখানা ও অন্যান্য ব্যবসায় লোডশেডিংয়ের কারণে কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলিয়ে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় ৩ কোটি মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছে যে কিছু উদ্যোক্তা কর্মীদের বেতন দিতে নিজেদের সঞ্চয়ের টাকাও ব্যবহার করছেন।

ধান-চাল উৎপাদনে পরিচিত নওগাঁ জেলায় বর্তমানে চালকল রয়েছে ৭০০টির বেশি। দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছেবিদ্যুৎ না থাকায় ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে মেশিন সচল রাখা হয়। এ রকমভাবে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশের কৃষি ক্রমেই বিদ্যুৎনির্ভর হচ্ছে। বিশেষ করে সেচের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। লোডশেডিং দীর্ঘ হলে কৃষককে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।

অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ

লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সমস্যা হলো এর বহুগুণ প্রভাব। একটি কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন কমে। উৎপাদন কমলে নির্দিষ্ট ব্যয় কমে না, ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ বাড়ে। জেনারেটর চালালে জ্বালানি ব্যয় যুক্ত হয়। উৎপাদন বিলম্বিত হলে সরবরাহ ও রপ্তানি সময়সূচিতে চাপ পড়ে।

বাংলাদেশের শিল্প খাত ইতোমধ্যে দুর্বল প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল চাহিদা, জ্বালানি সংকট ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে ৪৫০ ডায়িং কারখানা বিপাকে

নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানা থেকে কাপড় না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গ্যাস না থাকায় ডায়িং কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পোশাক কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

পোশাকশিল্পেও উৎপাদন অর্ধেকে

গ্যাসের পর বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিটিএমএ’র সদস্য বস্ত্রকলগুলোর বড় অংশও বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কারখানাগুলোতে ৩০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ডেনিম, ডাইং, ফিনিশিং ও স্পিনিংয়ের মতো গ্যাসনির্ভর খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানা মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

ডিজেলে উৎপাদন চালানোও কঠিন

গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের কারখানা চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে, যার খরচ প্রায় ৭০ লাখ টাকা।

শিল্পোদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন রপ্তানি আদেশ নিয়ে। সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন।

সিএনজি ফিলিং স্টেশনে নেই গ্যাস

এদিকে রাজধানীর কোনো সিএনজি ফিলিং স্টেশনে নেই গ্যাস, নেই পর্যাপ্ত প্রেসার। আর যেখানে গ্যাস আছে, সেখানে রয়েছে দীর্ঘ গাড়ির সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল থেকে দুপুরের তপ্ত রোদে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন সিএনজি চালিত গাড়ির চালকরা। গ্যাসের জন্য এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনেও ছুটছেন তারা। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর প্রগতি সরণি সড়ক ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

এই সড়কের আবুল হোটেল থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত রয়েছে চারটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন। কিন্তু এসব ফিলিং স্টেশনের মধ্যে দু’টিতে গ্যাস নেই। একটিতে পর্যাপ্ত প্রেসার নেই। আর একটিতে গ্যাস আছে, তবে প্রেসারও কিছুটা কম দেখা গেছে। ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানান,শুক্রবার আমাদের এখানে ‘১৮০ বার’ প্রেসার ছিল। শনিবার প্রেসার আছে ‘১৯০ বার’। তারপরও আমাদের দুইটি নোজল বন্ধ আছে। আর বাকি দুটি নোজল দিয়ে আমরা গাড়িগুলোতে গ্যাস দিতে পারছি। যদিও এই প্রেসার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।

তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) সাইদুল হাসান বলেন, সামিটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিতাস প্রায় ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছে। অথচ তিতাসের অধীন এলাকায় গ্যাসের চাহিদা ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। তিনি বলেন, এলএনজি সমস্যার আগে ২১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে বর্তমানে সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ চালু

সামিট এলএনজি টার্মিনাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে। সামিটের মুখপাত্র জানান, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। শনিবার রাত ২টার মধ্যে সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতা ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করার আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, সামিট শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে তাদের এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে। ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়বে এবং মধ্যরাতের মধ্যে পূর্ণমাত্রার সরবরাহে পৌঁছাবে।