• সিএনজিতে ভাড়া বেড়েছে স্টেশন প্রতি ৫ টাকা
  • গাড়িতে উঠলেই ১০ টাকা

খুলনার জ্বালানি তেলের বাজারে চলছে এখন এক অরাজক অবস্থা। পেট্রোল পাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর দীর্ঘ লাইনের বিপরীতে নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই চক্রটি সাধারণ চালকদের পকেট কাটছে প্রকাশ্যেই। নগরীর পাম্পগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের হাহাকার চললেও অলিগলিতে চড়া দামে মিলছে ড্রাম ভর্তি তেল। একই মোটরসাইকেল ঘুরে ফিরে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প থেকে একাধিকবার তেল নিচ্ছে। সেই তেল বিক্রি হচ্ছে বাইরের উচ্চ মূল্যে। এমন অবস্থায় চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে হিমশীম খাচ্ছে পেট্রোল পাম্প মালিকরা।

খুলনার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, বেলা ১১টায় তেল দেওয়ার কথা থাকলেও ভোররাত থেকেই মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর বড় একটি অংশই পেশাদার ‘তেল সংগ্রহকারী’। এই চক্রের সদস্যরা একবার তেল নেওয়ার পর দ্রুত দূরে গিয়ে তা ড্রামে ঢালছে এবং পুনরায় অন্য পাম্পে বা একই পাম্পে পোশাক পরিবর্তন করে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। ৩০০ টাকার তেল বারবার নিয়ে তারা মজুদ করছে এবং পরে তা লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে খুচরা বাজারে বিক্রি করছে। অনেক পাম্পে মোটরসাইকেলের জ্বালানি রাখার পর সংকটের ভয়ে সাধারণ চালকরাও বারবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সম্প্রতি এমন ঘটনা বুঝতে পেরে খুলনার এলেনা পেট্রোল পাম্প কর্তৃপক্ষ তেল বিক্রির সময় বাইকের টাওয়ারে রং দিয়ে চিহ্ন দিয়ে দেয়। কিন্তু বাইক চালকরা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আশেপাশের অন্য পেট্রোল পাম্পে পুনরায় গিয়ে সিরিয়াল দিয়ে তেল ভরছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য শুধু পাম্পের লাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রাহককে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এমন ঘটনায় সম্প্রতি ফুলতলা উপজেলার মেসার্স নওশিন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি পেট্রোল পাম্পে জরিমানা করেছে র‌্যাব-৬। এদিকে অনেক পেট্রোল পাম্প মালিকরা জ্বালানি সংকটকে পুঁজি করে ফায়দা লুটতে শুরু করেছে। নগরীর বাইপাস সড়কে কাকন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রির সময় পরিমাপে কম দেয়ার অভিযোগে খুলনা জেলা প্রশাসন জরিমানা করেছে। এমনকি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে ড্রাম ভর্তি তেল সংগ্রহ করে তা বাইরে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগও মিলেছে। সম্প্রতি বন বিভাগের স্টিমারের জন্য পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে সেটি উচ্চ মূল্যে নগরীর লবণচরা এলাকায় বিক্রির সময় প্রশাসনের কাছে ধরা পড়ে।

একাধিক পেট্রোল পাম্প শ্রমিকরা বলছেন, ‘আমরা অসহায়। মোটরসাইকেল চালকরাই এই সংকটের মূল কারিগর। একই মানুষ দিনে দশবার তেল নিচ্ছে। কেউ যদি একবারের বেশি তেল না পেত, তবে প্রকৃত চালকরা বঞ্চিত হতেন না।’

খুলনার পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোর তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় তেলের সরবরাহ খুব একটা কমেনি। তবে বর্তমানে বাজারে চাহিদা কয়েকগুণ বেশি দেখানো হচ্ছে। রেশনিং পদ্ধতিতে ডিলার ও এজেন্টদের তেল দেওয়া হলেও খুচরা পর্যায়ে গিয়ে তার নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।

এদিকে নৈরাজ্য রুখতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় একটি সফটওয়্যার বা অ্যাপ চালুর কথা বলা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী তেলের পরিমাণ ও সময় (যেমন: ৩ দিন অন্তর একবার) স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যাবে। এতে একজন চালক একবার তেল নিলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে দেশের আর কোনো পাম্প থেকে তেল নিতে পারবেন না।

বাংলাদেশ ট্যাংকলরি ওনার্স এসোসিয়েশনের (খুলনা বিভাগ ও বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা) সাধারণ সম্পাদক মো. সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, ‘বর্তমান সংকট যতটা না সরবরাহের, তার চেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনার। মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে থাকবে। অবিলম্বে অ্যাপভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থা এবং তেল দেওয়ার সময় রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হলে এই কালোবাজারি থামানো সম্ভব।’

অপরদিকে দূরত্ব যাই হোক না কেন ফুলতলা থেকে খুলনা সিএনজিতে ভাড়া বেড়েছে স্টেশন প্রতি ৫ টাকা হারে। গাড়িতে উঠলেই ১০ টাকা হারে ভাড়া দিতে হবে যাত্রীপ্রতি। অনেকটা মড়ার উপর খাড়ার ঘা। এখন থেকে ফুলতলা হতে ডাকবাংলা ৬০ টাকা এবং ফুলতলা হতে রুপসা ৭০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করেছে দৌলতপুর খুলনা বেবীট্যাক্সী সিএনজি চালিত অটোরিক্সা, থ্রি-হুইলার ড্রাইভার ইউনিয়ন।

সিএনজি চালক কামাল হোসেন হাওলাদার (৫০) বলেন, ‘৩০ বছর ধরে আমি গাড়ি চালাই। প্রথম দফায় ২ টাকা, দ্বিতীয় দফায় ৭ টাকা, তৃতীয় দফায় ১৮ টাকা ৮০ পয়সা লিটার প্রতি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারপর আমাদের ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ ইলিয়াস মোল্যা ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. মহিদুল ইসলাম গত ৫ এপ্রিল নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা তৈরি করে দিয়েছে। সেটি আমাদের ড্রাইভাররা গাড়িতে টানিয়ে দিয়েছে। তালিকায় দেখা যায় সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। এছাড়া ফুলতলা হতে রুপসা ৭০ টাকা এবং ডাকবাংলো ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বয়রা, বৈকালী, দৌলতপুর, রেলিগেট, ফুলবাড়িগেট, শিরোমণি, আফিলগেট, পথের বাজারসহ প্রতিটি স্টেশনের ভাড়া ৫ টাকা ভাড়া বৃদ্ধি করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।’

সোহেল রানা খন্দকার (৩২) অভিযোগ করে বলেন, ‘খুলনা থেকে ফুলতলা ২৩ কিলোমিটার রাস্তা। গত কয়েকদিন আগেও এক লিটার গ্যাস ৬১ টাকা ৮১ পয়সা দিয়ে কিনেছি। এখন অতিরিক্ত দামে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। সেকারণে ইউনিয়ন থেকে মাত্র ৫টাকা যাত্রী প্রতি ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।’

অপরদিকে ফুলতলার যুগ্নিাশা এলাকার ইঞ্জিনিয়ার মফিজুল ইসলাম বলেন, ১ লিটার গ্যাস দিয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তা চলতে পারে। সিএনজি চালক-মালিকরা ডাকবাংলো-ফুলতলার ভাড়াটা শুধু ৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ টাকা করে রাখতো আর বাকি সব অপরিবর্তিত রাখতো তাহলে সেটা হতো ন্যায্য এবং যুক্তিসংগত। কোনো কিছুর দাম বাড়লে সবারই লাভ থাকে শুধু ক্ষতিটা হয় সাধারণ মানুষদের।’

খুলনা পলিটেকনিক কলেজের ছাত্র দিপু ব্যানার্জি বলেন, ‘ফুলতলা থেকে খুলনা নগর পরিবহন বাস সার্ভিস চালু একান্ত প্রয়োজন। না হলে শিক্ষার্থীরা চরম বিপদে পড়বে। আমাদের দাবি আমাদেরই আদায় করতে হবে, ছাত্র-জনতা মিলে রাজপথে নামতে হবে, টাউন সার্ভিসের দাবিতে।’

দৌলতপুর খুলনা বেবীট্যাক্সী সিএনজি চালিত অটোরিক্সা, থ্রি-হুইলার ড্রাইভার ইউনিয়ন এর সভাপতি মো. ইলিয়াস মোল্যা ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. মহিদুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রীদের দাবি, অবিলস্বে প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে দিন দিন এদের অত্যাচার বেড়েই চলবে।