নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো: ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলেও শেষ প্রান্তিকে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ব্যবসায়ী মহলে।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে দেখা যাচ্ছে অনিশ্চয়তার ছাপ। অর্থবছরের শুরুতে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শেষ সময়ে এসে ছন্দপতন ঘটেছে। আমদানিকারকরা মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ সংকট নিয়ে শঙ্কিত, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা জ্বালানি সরবরাহে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জানতে চাইছেন। ফলে বাণিজ্যের উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, গত এক দশকে কন্টেইনার ও বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে গড়ে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সে ধারা থাকলেও শেষ তিন মাসে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৬ টিইইউ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৯৯ টিইইউ। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৮ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেলেও প্রবৃদ্ধির হার একই রয়েছে। এছাড়া এ সময়ে বন্দরে জাহাজ আগমন ঘটেছে ৩ হাজার ২৩০টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ধসের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বন্দর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে রপ্তানি কন্টেইনার ছিল ৭৯ হাজার ৭৬২ টিইইউ, ফেব্রুয়ারিতে তা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৪৩৮ টিইইউ এবং মার্চে নেমে আসে মাত্র ৬০ হাজার ২৬ টিইইউতে। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি কমছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানি কমে গেলে আমদানিও কমে যাবে, কারণ দেশের রপ্তানি খাতের কাঁচামালের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট, যা উৎপাদন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আমিন আহমেদ আব্দুল্লাহ জানান, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও বন্দর কার্যক্রম সচল রেখে প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে। তিনি বলেন, বছর শেষে প্রায় ৩৩ লাখ ৫০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের আশা করা হচ্ছে, যদিও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের রাজস্ব আদায়েও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। যদিও গত অর্থবছরে রেকর্ড ৭৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল এবং এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল এক লাখ কোটি টাকা।

কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, মার্চ মাসে আমদানি কিছুটা কমলেও উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য-বিশেষ করে জ্বালানি তেল, ক্যাপিটাল মেশিনারি ও খাদ্যপণ্য আমদানির কারণে রাজস্ব আদায়ের ধারা বজায় রয়েছে। মার্চ মাসে এককভাবে ৬ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।

বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি ও শিল্পোদ্যোক্তা নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে নতুন অর্ডার নেওয়া ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিদেশি ক্রেতারা এখন অন্তত চার মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার নিশ্চয়তা চাইছেন।

টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তফা হায়দার বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই সরকারকে দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।