ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ ও এসপিএম প্রকল্প চালু না হওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ, চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) অপরিশোধিত তেলের তীব্র সংকটে পড়ে তাদের সব ধরনের পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। গত ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ (সোমবার) বিকেলে কারখানাটিতে শেষবারের মতো পরিশোধন কাজ পরিচালিত হয়। এর ফলে দেশে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি সাধারণত দৈনিক গড়ে প্রায় ৪,৫০০ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে থাকে। তবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে (বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক) সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেল আমদানির প্রধান রুট 'হরমুজ প্রণালী' দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে।

সৌদি আরব ও আবুধাবি থেকে আসার কথা থাকা ১ লাখ টন করে দুটি তেলের চালান বাতিল হয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর দেশে নতুন কোনো ক্রুড অয়েলের চালান পৌঁছায়নি।

সংকট মোকাবিলায় ইআরএল কর্তৃপক্ষ ট্যাংকের তলানিতে জমে থাকা 'ডেড স্টক' এবং এসপিএম পাইপলাইনে থাকা ৫ হাজার টন তেল দিয়ে গত কয়েকদিন উৎপাদন সচল রেখেছিল। বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ১ মিটারের নিচে নেমে আসায় যন্ত্রপাতি রক্ষার স্বার্থে প্ল্যান্টটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাসের জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM) প্রকল্পটি জ্বালানি সাশ্রয় ও দ্রুত খালাসের কথা থাকলেও বর্তমানে তা সংকটের সমাধান দিতে পারছে না।

অপারেশনাল বিলম্ব: প্রকল্পটির গ্যারান্টি পিরিয়ড শেষ হয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে নানা আইনি ও টেন্ডার জটিলতা দেখা দিয়েছে।

আর্থিক ক্ষতি: এসপিএম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় জাহাজ থেকে তেল খালাসে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে পাইপলাইনে থাকা যৎসামান্য তেল ব্যবহারের পর এটিও এখন অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

পরিশোধিত পণ্যের অভাব: ইআরএল থেকে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি পাওয়া যায়। উৎপাদন বন্ধ থাকায় এসব পণ্যের জন্য এখন শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে পরিশোধিত তেল কেনার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।

বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে প্রভাব: সেচ মৌসুম ও গরমের তীব্রতায় ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের চাহিদা তুঙ্গে। শোধনাগার বন্ধ থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং কৃষি সেচ পাম্পগুলো জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।

জ্বালানি বিভাগ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ডিজেল ও অকটেন) পর্যাপ্ত মজুদ বর্তমানে দেশে রয়েছে এবং নতুন কিছু চালান পাইপলাইনে আছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌশলগত মজুদ মাত্র ৩৫-৪০ দিনের জন্য যথেষ্ট। যদি মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নতুন ক্রুড অয়েলের চালান না আসে, তবে পরিবহন ও শিল্প খাতে ভয়াবহ স্থবিরতা নেমে আসতে পারে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হওয়া কেবল একটি কারিগরি সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত তেল নিশ্চিত করতে না পারলে পহেলা বৈশাখের পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষকে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হতে পারে।