ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে শরিয়াহ গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, শরিয়াহ বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি সুরক্ষা দিতে হবে এবং তাদের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ‘ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন গভর্নর। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সভায় গভর্নর বলেন, শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা গেলে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এতে অনিয়ম ও অর্থপাচার কমবে এবং ইসলামী ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে।

তিনি বলেন, অতীতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ ছিল যথাযথ তদারকির অভাব। ইসলামী ব্যাংকিং মূলত সম্পদভিত্তিক কাঠামোর ওপর পরিচালিত হওয়ার কথা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, আলেম-ওলামা এবং বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটাতে ২০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন।

সুপারিশে সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রতারণামুক্ত লেনদেন এবং লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগির ভিত্তিতে বিনিয়োগ পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, সেক্রেটারিয়েট ও অডিট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এছাড়া বড় বিনিয়োগে অন্তত তিন সদস্যের শরিয়াহ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা এবং শরিয়াহ অডিটরদের (মুরাকিব) সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সভায় স্বতন্ত্র ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিং তদারকির জন্য আলাদা ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে পৃথক কমপ্লায়েন্স বিভাগ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে বছরে অন্তত একবার বাহ্যিক শরিয়াহ অডিট চালু, শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স রেটিং প্রবর্তন এবং ইসলামী ব্যাংকের জন্য পৃথক কোর ব্যাংকিং সিস্টেম চালুর সুপারিশও করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের জন্য শরিয়াহ বিষয়ক জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা, আলেমদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে সম্পৃক্ত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী অর্থনীতি বিভাগ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এছাড়া শরিয়াহসম্মত মুদ্রাবাজার উপকরণ চালু, তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং খেলাপি বিনিয়োগ দ্রুত আদায়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।

সুপারিশে অর্থপাচার রোধে কঠোর শাস্তির বিধান এবং বড় দুর্নীতিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করার দাবিও উত্থাপন করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ লক্ষ্যে গবেষণা কেন্দ্র ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি স্থাপন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন এবং বিশ্বখ্যাত শরিয়াহ স্কলারদের আমন্ত্রণের বিষয়েও মত দেওয়া হয়।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, মুফতি শাহেদ রহমানী, ড. মুফতি ইউসুফ সুলতানসহ বিভিন্ন ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।