তৌফিক রুবেল, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) : কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমি এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। একসময় বছরের অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধতায় পড়ে থাকা এসব জমিতে বর্তমানে বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, যা বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন ইলিয়টগঞ্জ, আদমপুর, পুটিয়া, বাসরা, রায়পুর, সিংগুলা, লক্ষ্মীপুর ও সুহিলপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ১১৫টি মৎস্য প্রকল্প। এসব প্রকল্পে বছরে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন মাছ। এখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, সরপুঁটি ও তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। নগদ টাকায় মাছ বিক্রি করে সন্তুষ্ট স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা। মৎস্য প্রকল্পের স্বত্বাধিকারী মো. নুরুদ্দীন আহমেদ জানান, গত আট বছরে তার প্রকল্প ছোট পরিসর থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৬০০ বিঘা জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। তবে মাছের খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “সরকার যদি এই খাতে নজর দেয় এবং বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।” চারবার জাতীয় পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেন, একই জমিতে ধান ও মাছ চাষ এখন দাউদকান্দির বাস্তবতা। একসময় পরিত্যক্ত প্লাবনভূমি আজ দেশের একটি মডেল মৎস্য অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, মাছের খাদ্যের দাম কমানো এবং আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা গেলে এই খাত আরও এগিয়ে যাবে। মৎস্য প্রকল্পের কেয়ারটেকার মো. রুহুল আমিন জানান, প্রতিদিন দুই বেলা প্রায় ৮০ বস্তা খাবার দিয়ে রুই, পাঙ্গাস, কার্প ও তেলাপিয়া চাষ করা হচ্ছে। তবে বাড়তি বিনিয়োগের তুলনায় লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক হিমাগারের অভাব বড় একটি সমস্যা। সময়মতো মাছ সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক সময় কম দামে বিক্রি করতে হয়। এছাড়া মৃত খালগুলো পুনঃখনন করা গেলে পানি ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে এবং উৎপাদন বাড়বে। দাউদকান্দি উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোসা. সাবিনা ইয়াছমিন চৌধুরী বলেন, প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ এখন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি উৎপাদন দিচ্ছে। স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত মাছ চাষি মোহাম্মদ রহমত আলীর সাফল্য অন্য চাষিদের উৎসাহিত করছে। তিনি জানান, মৎস্য খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং হিমাগার স্থাপনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।সব মিলিয়ে দাউদকান্দির প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়; এটি দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতে এক নীরব বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠেছে।