কৃষকের সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা ক্ষতি
মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, হবিগঞ্জ সংবাদদাতা : টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক পানিবৃদ্ধিতে হবিগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে জেলার প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে এবং আরও অন্তত ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে কৃষি খাতে প্রায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জ জেলায় মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে ৪৬ হাজার ৯৫৪ হেক্টর জমিতে। তবে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির মাঝে হাওরের প্রায় ৬৫ শতাংশ জমির ধান কাটা সম্ভব হলেও বাকি ফসল পানিতে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কৃষকরা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার মতো বানিয়াচং উপজেলাতেও ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। উপজেলার কৃষক জমির আলী জানান, তিনি চলতি মৌসুমে ২৫ কেয়ার জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। কিন্তু সময়মতো ধান কাটতে না পারায় মাত্র ৫ কেয়ার জমির ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
একই উপজেলার আরেক কৃষক ফজর আলী বলেন, ঋণ নিয়ে ৮ কেয়ার জমিতে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু অতি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তার ৫ কেয়ার জমির ধান তলিয়ে গেছে। ফলে ঋণ পরিশোধ ও সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, এবারের প্লাবনে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে দুইভাবে। পানিতে তলিয়ে সরাসরি প্রায় ২০৯ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। এছাড়া কাটা ধান শুকাতে না পারায় আরও প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে জেলার মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ২১ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব কৃষককে তিন মাসের জন্য সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও বীজ, সারসহ বিভিন্ন প্রণোদনা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে কৃষকদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে সরকার ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করেছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা জ্যোতি বিকাশ ত্রিপুরা জানান, জেলায় চলতি মৌসুমে ৮ হাজার ৯০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের পাশাপাশি প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন চাল কেনা হবে। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেয়ে কিছুটা উপকৃত হবেন বলে আশা করছে খাদ্য বিভাগ।
সার্বিকভাবে হাওরাঞ্চলের এই দুর্যোগে কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। দ্রুত সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।