বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী ব্যুরো : রাজশাহীতে একদিকে শহর এলাকায় চলছে পুকুর ভরাট। আর অন্যদিকে গ্রামে কৃষি জমি কেটে করা হচ্ছে পুকুর খনন। এই অপকর্ম থামাতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

রাজশাহী মহানগরীতে শতাব্দীকালের বেশি সময় ধরে শত শত পুকুর মানুষের নানা প্রয়োজন পূরণ করে আসছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা, আগুন লাগলে পানির উৎস হিসেবে কাজ করা, মাছের চাহিদার অর্ধেকের বেশি পূরণ করা, বাড়ির গৃহস্থালীর বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ প্রভৃতি। কিন্তু এসব পুকুর ভরাট করে একশ্রেণির ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির লোকের অর্থলিপ্সা পূরণ হচ্ছে মাত্র। অন্যদিকে গত এক যুগে রাজশাহী অঞ্চলে কতো পরিমাণ ফসলি জমি পুকুরে রূপান্তরিত হয়েছে, তার পরিসংখ্যান হালনাগাদ করা যাচ্ছে না। ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া ও আরো নানান চাপে অনেক কৃষক জমি পুকুরে রূপান্তর হতে দিচ্ছেন। আবার এই পুকুরগুলো টিকিয়ে রাখতে পানি তোলা হচ্ছে ভুগর্ভ থেকে। কিন্তু কতদিন এভাবে চলবে, তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তবে এর বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। আশেপাশের জমির উর্বরতা কমছে, কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন হুমকিতে পড়ছে।

পুকুর ভরাট পরিস্থিতি

শহরে পুকুর ভরাটের মহোৎসব ঠেকাতে ২০১০ সালে হাইকোর্টে রিট করেন রাজশাহীর পরিবেশ ও ইতিহাস গবেষক-লেখক মাহবুব সিদ্দিকী। এই রিট অনুযায়ী বিভাগীয় শহরের পুকুর ভরাটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণের জন্য বলা হয় আদালতের নির্দেশে। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পরিস্থিতি যাচাই করে এবং যৌক্তিকতা বিচার করে অনুমতির বিষয়টি দেখবেন। কিন্তু এই আদেশের অসদ্ব্যবহার করে পুকুরের মালিকরা। তারা নানা কৌশলে পুকুর ভরাট করে নেয়। পরে ভূমি অফিসের সহায়তায় ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ভিটা অথবা ফসলি জমি দেখিয়ে কাগজপত্র তৈরি করে নেয়। এতে প্রচুর পরিমাণ টাকার লেনদেন ঘটে। এভাবে দুই-আড়াই দশকে বহু সংখ্যক পুকুর ভরাট হয়ে যায়। বিশেষ করে শহরগুলোতে ডেভলপার কোম্পানিগুলো সক্রিয় হওয়ার পর এই ভরাটের আয়োজন জোরদার হতে থাকে।

মাহবুব সিদ্দিকী জানান, পঞ্চাশের দশকে রাজশাহীতে ছোট-বড় পুকুর ছাড়াও নানাপ্রকারের জলাশয় যেমন, পুকুর, দিঘি, ডোবা, নয়ানজুলি, খাল ইত্যাদিসহ পানির আধারের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। পরবর্তীকালে সড়ক, মার্কেট, ভবন, টার্মিনাল প্রভৃতির জন্য সরকারি ও বেসরকারী উদ্যোগে এসব পুকুর-জলাশয় ভরাট হতে থাকে। ঢালাওভাবে এই ভরাট কাজ চলতে থাকলে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো হ্রাস পেতে থাকে। তাঁর মতে, ৯০-এর দশকে কেবল পুকুরের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় প্রায় ৭ শত। ভরাটের এই ধারা অব্যাহত থাকার ফলে ২০১০ থেকে ২০১৫-এর মধ্যে এই সংখ্যা দাঁড়ায় তিনশতের মধ্যে। সর্বশেষ আনুমানিক হিসেবে ২শ’র বেশি হবে না বলে তিনি মনে করেন। যদিও আর কোনো পরিসংখ্যান নতুন করে হালনাগাদ করা হয়নি। এই ভরাটের মূল কারণ হিসেবে, নগর উন্নয়ন, ভূমির উচ্চমূল্য এবং অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে পুকুরগুলো ভরাট করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্রগুলোর মতে, উচ্চ আদালতের আদেশকে প্রশাসনিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে এর অপব্যবহার হয়েছে। তবে সামাজিক সংগঠনগুলো সোচ্চার হওয়ার প্রেক্ষিতে মাঝেমধ্যে প্রশাসনিক কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। বর্তমানে প্রশাসন পুকুর ভরাট বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে হয়তো অবশিষ্ট পুকুরগুলো ভরাট হওয়া থেকে বেঁচে যাবে, কিন্তু ভরাট করা পুকুর পুনর্র্খনন কতোটা সম্ভব হবে এনিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। রাজশাহী বিভাগীয় প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে, রাজশাহীতে আর কোনো পুকুর ভরাট হতে দেয়া হবে না। ভরাটকৃত পুকুরগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি অভিযান চলমান রয়েছে। রাজশাহী মহানগরীর মোল্লাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুরগুলো যে ভরাট করেছে তার খরচেই পুনরায় খনন করার নির্দেশ প্রদান ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, পরিবেশ রক্ষায় আর কোনো পুকুর ভরাট করা যাবে না এবং অবৈধভাবে ভরাট করা পুকুরগুলোর বিষয়েও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরই অংশ হিসেবে গত ফেব্রুয়ারিতে নগরীতে অবৈধভাবে পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ভরাট কাজ বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। নগরীর শাহাজিপাড়া এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। পবা উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত অভিযানে গাইপুকুর নামে পরিচিত একটি পুরাতন পুকুরের ভরাট কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এই পুকুরটি সম্প্রতি মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছিল, যা পরিবেশ ও জলাধার সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থী। এলাকাবাসীর দাবি, এটি একটি পুরাতন জলাধার, যা স্থানীয় পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদিও মালিকের দাবি, আরএস খতিয়ানে জমিটি আমবাগান হিসেবে উল্লেখ আছে।

গ্রামে পুকুর খনন

গ্রামে কৃষি জমি কেটে পুকুর তৈরির এক আত্মঘাতি প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে রাজশাহী অঞ্চলে। কৃষকরা বলছেন, রাজশাহীর দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাগমারা, মোহনপুর, পবা, তানোর ও গোদাগাড়ী এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে উর্বর ফসলি জমি কেটে পুকুর খনন চলছে। জানা গেছে, এমনকি উর্বর তিন ফসলি জমিও কেটে বাণিজ্যিকভাবে পুকুর খননের মাত্রা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এটি স্থানীয় কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অল্প খরচে ১০-১২ বছর মাছ চাষের উচ্চ মুনাফার লোভে জমির মালিকরা বা প্রভাবশালীদের চাপে ফসলি জমি পুকুরে রূপান্তরিত করছে। এভাবে গত ৮ বছরে রাজশাহীতে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর কৃষি জমি কমেছে। মূল্যবান টপসয়েল কেটে পুকুর করায় আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে এবং স্থানীয় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এতে জমিতে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। পুকুর খননে বাধা দেয়ায় হামলার ঘটনাও ঘটছে, এমনকি ভেকুর নিচে ফেলে হত্যার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অবৈধভাবে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর কাটা হচ্ছে। এই অবৈধ খনন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ঘটছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না।

রাজশাহীতে তিন ফসলি উর্বর কৃষি জমি কেটে বড় বড় আকারে তৈরি এসব পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এসব পুকুর কাটার ফলে আশপাশের এলাকায় তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন। পুকুর কেটে মাছচাষের কারণে ক্ষতি হচ্ছে মাটির উর্বরা শক্তির। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূমিদস্যুরা এসব উর্বর জমিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে। প্রশাসন থেকে মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান হলেও তা বন্ধ হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গত আট বছরে রাজশাহী জেলায় ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে নির্বিচার পুকুর কাটার কারণে। আর এ সময়ের মধ্যে জেলায় বেড়েছে পুকুরের সংখ্যাও। একই সঙ্গে ফসলি জমিতে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, অবৈধ ইটভাটা, রাস্তাঘাট এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ফলে কৃষিকাজের বিশাল ক্ষেত্র স্থায়ীভাবে ধ্বংস হচ্ছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটোর, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবৈধ পুকুর খনন বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহীতেও ধারাবাহিকভাবে পুকুর খনন হচ্ছে। রাজশাহীর মাছ ব্যবসায়ীরা পাশের জেলাগুলোতে এখন গিয়ে পুকুর খনন করছেন। সেখানে জমির ইজারা খরচ অনেক কম। ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা বেশি। যদি বিলের মাঝখানে পুকুর খনন করা হয়, তাহলে আশপাশের খেত জলমগ্ন হয়ে যায়। চাষাবাদও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। কৃষি বিভাগের হাতে এর প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই।