রাজশাহী অঞ্চলে ধান ও চালের বাজারে হঠাৎ বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। যার ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। বাজারে ধানের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং সরকারি খাদ্য সংগ্রহ অভিযান ধীরগতিতে চলায় মিলার ও মজুতদারদের দাপটে ধানের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রান্তিক কৃষকরা চরম লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।

জানা গেছে, সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে স্থানীয় বাজারে ধানের দাম কম থাকায় এবং সঠিক সময়ে সরকারি সংগ্রহ শুরু না হওয়ায় কৃষকরা সরাসরি সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে রাখছেন, যার ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সার, বীজ, শ্রমসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা লোকসানে পড়ছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারিভাবে দ্রুত ও কার্যকর উপায়ে ধান-চাল সংগ্রহ এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসে প্রতিমণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। অন্যদিকে চালের বাজারে প্রতিকেজিতে ২ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত দর কমেছে। রাজশাহীর ধানের হাটগুলো ঘুরে দেখা যায়, ব্রি-২৮ ধান প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১৩৫০ থেকে ১৪০০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল প্রায় ১৬০০ টাকা। জিরাশাইল ধান ১৯০০ টাকা থেকে নেমে এসেছে ১৬০০ টাকায়। ব্রি-৭৫ ধান ১৩৫০ টাকা থেকে কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ১১৫০ টাকায়। একইভাবে স্বর্ণা-৫ ধান ১২০০ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১০০০ টাকায়। একজন আড়তদার জানান, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জেলার বাইরের ব্যবসায়ীরা কম আসছেন। এছাড়া নতুন ধান বাজারে আসার সম্ভাবনায় সরবরাহ বেড়ে গেছে, যা দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে। হাটে ধান নিয়ে আসা একজন কৃষক বলেন, “ঈদের পর দাম বাড়বে ভেবে ধান ধরে রেখেছিলাম। কিন্তু এখন উল্টো দাম আরো কমে গেছে। এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫০০ টাকা, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১২০০ টাকায়। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।” কেশরহাট ধান বাজারের একজন আড়তদার বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যার ফলে পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে বাইরের জেলার ক্রেতা কমে গিয়ে বাজারে ক্রেতা সংকট দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে চাল ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের সংকটে রয়েছেন। বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় তারা ধান বেশি দামে কিনতে পারছেন না। রাজশাহীর বিভিন্ন চালকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশ থেকে চাল আমদানি বেশি থাকায় দেশী চালের চাহিদা কমেছে। পবা উপজেলার একজন চালকল ব্যবসায়ী বলেন, “গত বছর এই সময়ে ৫০ কেজির এক বস্তা আঠাশ চাল ৩৫০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন বিক্রি হচ্ছে ৩১০০ টাকায়। এতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।” আরেক ব্যবসায়ী জানান, “চালের দাম কম থাকায় ধানও কম দামে কিনতে হচ্ছে। এতে প্রতি লটে লোকসান গুনতে হচ্ছে।” রাজশাহীর সাহেবাজার, বাণেশ্বর ও চারঘাটের চালের মোকামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে স্বর্ণা-৫ চাল প্রতি কেজি ৪২-৪৩ টাকা, জিরাশাইল ৬৭-৬৮ টাকা, কাটারীভোগ ৭৪-৭৬ টাকা এবং বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৫৮-৬০ টাকায়। অথচ এক মাস আগেও এসব চালের দাম ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই দরপতনের অন্যতম কারণ বাজারে চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি হওয়া। চালকল মালিকরা বলছেন, ধান ও চালের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারকে মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। কৃষক ও ব্যবসায়ী দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় ন্যূনতম লাভ নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কৃষক ও চালকল শিল্প উভয়ই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।