হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা : কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পানির চাপে তলিয়ে গেছে কয়েকশ হেক্টর জমির বোরো ধান। কাটার আগমুহূর্তে ফসলের এই করুণ দশা দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। মাঠজুড়ে এখন পাকা ধানের ঘ্রাণের বদলে কেবলই কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর আর্তনাদ।

আকস্মিক দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড স্বপ্ন

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ বোরো ধান এখন পানির নিচে। বিশেষ করে নিচু এলাকার জমিগুলোতে বুক সমান পানি জমে গেছে। অথচ মাত্র কয়েকদিন পরেই এই ধান ঘরে তোলার কথা ছিল। সোনালি ধানের বদলে এখন কেবলই ঘোলা জলের স্রোত।

অনেক কৃষককে দেখা গেছে বুক সমান পানিতে নেমে আধাপাকা ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করতে। কিন্তু সেই ধান গবাদি পশুর খাদ্য ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না বলে জানিয়েছেন তারা।

কৃষকের হাহাকার

উপজেলার পুমদী ইউনিয়নের চরপুমদী গ্রামের কৃষক বিল্লাল উদ্দীন বলেন: “অনেক ধার-দেনা করে পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছিলাম। ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু দুই দিনের বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে আর সারাবছর পরিবারকে কী খাওয়াব, তা ভেবে চোখে অন্ধকার দেখছি।”

গোবিন্দপুর ইউনিয়নের পানান বিলের আরেক কৃষক মরিয়ম বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “হাত বাড়ালেই ধান পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সেই ধান পানির তলায় পঁচছে। আমাদের কপালটাই পুড়ে গেল।”

ক্ষতির পরিমাণ ও সরকারি ভাষ্য

স্থানীয় কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে উপজেলার কয়েকশ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ধান রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, “আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি, যাদের ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে। সরকারিভাবে কোনো প্রণোদনা বা সহায়তার নির্দেশনা আসলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিপর্যস্ত গ্রামীণ অর্থনীতি

হোসেনপুরের সাধারণ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস এই বোরো ধান। এমন দুর্যোগে শুধু কৃষক নয়, এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় পুরো বাজার ব্যবস্থায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এখন সরকারের কাছে জরুরি সহায়তা ও কৃষি ঋণ মওকুফের দাবি জানিয়েছেন।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে হোসেনপুরের কৃষকের ঘরে এখন নবান্নের উৎসবের বদলে চলছে শোকের মাতম।

ভালুকা : অতি বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটে পানির নিচে তলিয়ে গেছে পাকা ধান, দিশেহারা কৃষক মোঃ বদিউজ্জামান, (ভালুকা) ময়মনসিংহ সংবাদদাতাঃ হাওর অঞ্চলের ন্যায় অতিবৃষ্টি ও তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা এ অঞ্চলের কৃষকেরা।

সরেজমিনে জানা যায়, কঠোর পরিশ্রমে চাষাবাদ করা ধান সময়মত পেকে গেলেও তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে সেই ফসল ঘরে তুলতে পারেনি কৃষকেরা। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হওয়া অতিবৃষ্টির ফলে খাল, বিল, নদীনালা পানিতে ভরে গিয়ে পানির নিচে তলিয়ে গেছে এ অঞ্চলের অধিকাংশ ধানের জমি। উপজেলার মল্লিক বাড়ী, মেদুয়ারী, ভরাডোবা, ধীতপুর, ভালুকা, রাজৈ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকেরা এখন দিশেহারা। চাষাবাদকৃত ২০/২৫ শতাংশ জমির ধান কৃষকেরা কাটতে পারলেও রোধের অভাবে সেটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী এ বছর উপজেলায় মোট ১৮৬৭০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪৯০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় উপশি জাতের এবং ২১৮০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড জাতের ধান চাষাবাদ হয়েছিল। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় মাত্র ৪১০৭ হেক্টর জমির ধান কৃষকেরা কাটতে পেরেছেন। এবং এযাবৎ ৪৫৪ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছেন।এখনও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হছে। উপজেলার মল্লিক বাড়ি ইউনিয়নের ভান্ডাব গ্রামের কৃষক শহীদ উল্লাহ মন্ডল বোরো মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। সময়মত ধান পেকে গেলেও তীব্র শ্রমিক সংকটে ১ শতাংশ জমির ধানও কাটতে পারেনি।এখন অতিবৃষ্টির কারণে তাঁর সমস্ত জমির ধান তলিয়ে গেছে। মল্লিক বাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনজুরুল হক পাঠান জানান তার ইউনিয়নের ভান্ডাব ও সাতেঙ্গা এলাকার অধিকাংশ জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

বিরামপুর (দিনাজপুর)

শ্রমিক সংকটে ধান কর্তন করতে পারছেন না কৃষক। অতিবৃষ্টি ও বাতাসে পরিপক্ক ধান ক্ষেতে পড়ে থাকায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক তাইজুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, রুবেল জানান, পাকা ধান বাতাসে ক্ষেতের মধ্যে পড়ে যাওয়ায় এবং বৃষ্টির পানি জমিতে জমে থাকায় হারভেস্টার দিয়ে ধান কর্তন করা সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিক সংকট, তার ওপর শ্রমিকের মজুরীও বেড়েছে। দূরত্ব হিসেবে ধান কর্তন করতে প্রতি বিঘায় কৃষককে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। তারা আরো জানায়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্ব গতিতে তেলের দাম, শ্রমিকের মূল্য, কীটনাশক, সারের মূল্য, সেচের দাম ইত্যাদি সহ প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমান বাজারে প্রতিমন ধান সাড়ে ৮ শত থেকে সাড়ে ৯ শত টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন খরচ হিসাবে বর্তমান বাজার মূল্যে কৃষকের লোকসান গুনতে হবে বলে তারা মনে করছেন এবং প্রান্তিক চাষী তারা উৎপাদন খরচ তুলতে পারবেননা । সরকার ধানের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ না করে দিলে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষক ধানের সরকারি ক্রয় মূল্য পুনঃ নির্ধারণের দাবি জানান।

বিরামপুর উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা কমল কৃষ্ণ রায় জানান, উপজেলায় জিরা সাইল ,শম্পা কাটারি, ব্রি ধান-২৮ ব্রি ধান-২৯, হাইব্রিড হীরা-২ এসি আই-২, প্রভৃতি জাতের ১৫ হাজার ২ শত ৫৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানে চাষ হয়েছে। বিরামপুরে উপজেলায় বাম্পার ফলন হবে বলে তিনি আশা পোষণ করেন।