সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা : বগুড়ার সারিয়াকান্দির বিভিন্ন চরাঞ্চলে ভুট্টার বাম্পার ফলন হয়েছে। যমুনার ভাঙন আর বালুচরের ধূসর ধূসরতা যেখানে এক সময় ছিল কৃষকের দীর্ঘশ্বাস, সেখানে এখন বইছে আনন্দের হিল্লোল। বগুড়ার সারিয়াকান্দির যমুনা বিধৌত চরাঞ্চল এখন দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ যেন সোনালী গালিচায় মোড়ানো। ধানের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে কৃষকরা এখন ভুট্টার নির্ভরযোগ্য মুনাফায় খুঁজে পেয়েছেন সচ্ছলতার নতুন দিশা।

উপজেলা কৃষি অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি মৌসুমে সারিয়াকান্দিতে ভুট্টার আবাদ কেবল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই করেনি, বরং তৈরি করেছে নতুন রেকর্ড। চলতি বছর ৮ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৩৯৫ হেক্টর বেশি এবং এর সিংহভাগই (প্রায় ৭,৫০০ হেক্টর) যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া আর পলিমিশ্রিত মাটির গুনাগুন এবার আবাদ বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। চরাঞ্চলের চিরচেনা ফসল ধান বা ডাল ছেড়ে কৃষকদের এই ‘ভুট্টা বিপ্লবে’ শামিল হওয়ার পেছনে রয়েছে শক্ত অর্থনৈতিক সমীকরণ। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে ধান চাষে যে পরিমাণ সেচ ও শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, ভুট্টায় তার অর্ধেকও লাগে না।

শোনপচা চরের কৃষক বিল্লাল মন্ডল জানান, বিঘাপ্রতি ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে অনায়াসেই ৬০-৬৫ হাজার টাকার ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। ভুট্টার দানা বিক্রির পাশাপাশি এর গাছ ও অবশিষ্টাংশ জ্বালানি এবং উন্নত মানের পুষ্টিকর গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে গৃহস্থের পশুপালনেও খরচ কমছে।

যমুনার চরে প্রতিকূল আবহাওয়া একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে ভুট্টা গাছের সহ্যক্ষমতা বেশি হওয়ায় বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া কৃষকের লোকসানের ভয় নেই। ১৫-২০ শতাংশ সামান্য জমিতেও ২০-২২ মণ ফলন পাওয়ায় খুশি ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিরা। জাহিদুল ইসলামের মতো অনেক প্রান্তিক চাষি এখন ঋণের জাল ছিঁড়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

বাংলাদেশে পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড (মাছ ও মুরগির খাদ্য) শিল্পের প্রসারে ভুট্টার চাহিদা এখন তুঙ্গে। ফলে কৃষকদের ফসল বিক্রির জন্য আড়তদারদের পেছনে দৌড়াতে হচ্ছে না; বরং পাইকাররাই পৌঁছে যাচ্ছেন চরের দোরগোড়ায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ভুট্টা এখন এই অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি। আমরা মাঠ পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। এবছর ভুট্টার গড় ফলন হয়েছে ১০ মেট্রিকটন। খরচ কম ও অধিক লাভে দিনদিন কৃষকরা এ ফসলটি চাষে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।

সারিয়াকান্দির এই সোনালী বিপ্লব প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা আর উপযোগী ফসলের নির্বাচন গ্রামীণ অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে। যমুনার বালুচরে আজ যে ভুট্টার হাসি দেখা যাচ্ছে, তা কেবল ফসল নয়—তা হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার নতুন নিশ্চয়তা।