সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সরকার গণতান্ত্রিক রীতি ভঙ্গ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। দলের পক্ষ থেকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি। গতকাল মঙ্গলবার মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এই প্রতিবাদ জানান।

এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর মাত্র এক মাস গেছে। আমরা অপেক্ষায় থাকব, আমরা প্রতিবাদ করছি। সামনে পর্যায়ক্রমে আমরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কর্মসূচি দেব। তিনি বলেন, সরকার তাদের ইশতেহারের কাজ নিয়ে এগিয়ে যাবে, আমরা বিরোধী দল হিসেবে জনগণের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরব। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে সমন্বয় করে ভূমিকা রাখতে পারলে ইতিবাচক হবে, না হলে আন্দোলন মাঠে চলবে, সংসদও উত্তপ্ত হবে। আমরা সেভাবেই ভূমিকা রাখব।

মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, গত ২২ ফেব্রুয়ারি ৬ সিটি করপোরেশনে এবং ১৪ মার্চ ৫ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। অথচ ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আলাপচারিতায় বোঝা গিয়েছিল যে, খুব শিগগিরই স্থানীয় নির্বাচন হবে। জাতীয় নির্বাচনের পর জনগণের প্রত্যাশা-স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে, সরকার ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এই প্রশাসকরা হলেন, তাদের দলীয় নেতাকর্মী এবং যারা নির্বাচনে হেরেছেন। যেমন ঢাকা-১৫ আসনে হারা শফিকুল ইসলাম মিল্টনকে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। খুলনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পরাজিত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে।

তিনি বলেন, হারজিত থাকবেই, কোন ব্যক্তিকে টার্গেট করে কথা বলছি না। আমাদের বক্তব্য হলো-সরকার গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ওপর আঘাত করেছে। সরকার অপেক্ষা করতে পারতো। কারণ গত ১৮ বছর আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলনের সময় ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে যেসব বিষয় তুলে ধরেছিলাম, সেটারই একটা হচ্ছে-জনমতের তোয়াক্কা না করে দলীয় লোকদের বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সরকার ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে জনগণের মতামত ও জুলাইয়ের স্প্রিটকে অবজ্ঞা করেছে।

মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ১৫ মার্চ ৪২টি জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জামায়াতে ইসলামী সাতটি জেলায় নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে। ৬টি জেলায় একটি ছাড়া সব আসন পেয়েছে। অথচ সরকার ৪২টি জেলায় তাদের দলীয় লোক নিয়োগ দিয়েছে। তারা বিশিষ্ট ব্যক্তি হলে ভিন্নভাবে চিন্তা করার ছিল।

কিন্তু যারা বিপুল ভোটে হেরেছেন, যেমন গাইবান্ধ ৩ আসনে বিএনপির জেলা সভাপতি জামায়াতের প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরেছেন, তাকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। গাইবান্ধার ৫টির মধ্যে চারটি জামায়াত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। কুড়িগ্রামে চারটির মধ্যে সবকটিতেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সেখানেও নির্বাচনে হারা বিএনপি নেতাকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা একধরনের হাস্যকর বিষয়।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, আমরা মনে করি-স্থানীয় সরকার নির্বাচন সচল হওয়া দরকার এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিতরাই এগিয়ে আসুক, সে যে দলেরই হোক। এক্ষেত্রে সরকার নিজেদের দলের সুবিধা নেওয়ার জন্য এবং নিজেদের দলের লোকদের আগে থেকেই পরিচিত করে মাঠে ভিন্ন একটা অবস্থান তৈরি করার জন্যই এ জাতীয় কাজ করেছে। যেটা গর্হিত কাজ হয়েছে। যাতে গণতন্ত্রের আচরণের ভূমিকার পরিচয় দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, সোমবার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পরিবর্তন করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা কর্তৃপক্ষ ইউজিসির চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হয়েছে। তাদের কোন ধরনের যোগ্যতার ঘাটতির কারণ বোঝাতে পারলে আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক যাচাই বাছাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তন হবে-এতে ভিন্ন মত নেই। কিন্তু পদত্যাগ করিয়ে, যিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে পোস্টারিং, ক্যাম্পেইন ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে মিটিং করেছেন, তাকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর নিয়োগ করা হয়েছে। এরমাধ্যমে সরকার দলান্ধ লোকদের পোস্টিং দিয়ে খুশি করার ব্যবস্থা নিয়েছে, যেটা নিন্দনীয় এবং জুলাইয়ের স্প্রিট-মেধার অবমাননা। মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর নিয়োগ হবে-এটা আমরা চাই। কিন্তু দলীয় পরিচিতি আর দলীয় সমর্থক হওয়া, যারা দলীয় প্রতিনিধিত্ব করেছে, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য পোস্টারিং করেছে, এসব লোকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর নিয়োগ করে সরকার জুলাই স্প্রিটের বিরুদ্ধে বার্তা দিয়েছে বলে মনে করি।

মাওলানা আব্দুল হালিম আরো বলেন, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে মোস্তাকুর রহমান নামের ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা নজিরবিহীন। কোন ব্যবসায়ী অতীতে গভর্নর হননি। নাগরিক এবং শিক্ষিতদের মধ্য থেকেই অতীতে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে জোর করে একজনকে হটিয়ে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়ার নিন্দা জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও সংস্কৃতি সমন্বিত থাকবে, ফ্যাসিস্ট আমলে যেটা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে আমরা সবাই মিলে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছি-এ জাতীয় কাজ থেকে সরকার বিরত থাকবে, সামনে এজাতীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সতর্কভাবে ভূমিকা পালন করবেন এবং এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে জনগণের মতের বিপরীত বিষয় বাতিল করে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, একজন নির্বাচন কমিশনার কিছুদিন আগে বলেছেন, রমযানের পর একমাসের মধ্যে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পদক্ষেপ নেবেন। আমরা মনে করি, যথাশীঘ্র সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সহযোগিতা করা উচিত এবং এসব প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে জনগণের মাঝে যে ধোয়াশা তৈরি হয়েছে, তা দূর করা উচিত।