বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে দেশের মানুষের আত্মপরিচয়, স্বাধীন সত্তা ও জাতীয় ঐক্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি দেশপ্রেম, স্বাধীন সত্তা ও জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন।

সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ (সিবিএস) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সংগঠক রুহুল আমিনের লেখা ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ : তারেক রহমান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। একই অনুষ্ঠানে সিবিএসের গবেষণা কার্যক্রমের ‘ইনফরমেশন, রিসার্চ অ্যান্ড কালচারাল উইং’-এর ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, একটি জাতির আত্মপরিচয় বুঝতে হলে তার ইতিহাস, সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তার ধারাবাহিকতা বুঝতে হয়। রুহুল আমিনের বইটি এ আলোচনাকে সমৃদ্ধ করার একটি সময়োপযোগী প্রয়াস। জ্ঞান ও গবেষণার আলোচনা কোনো দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও মুক্ত আলোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সময়ে ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে নানা তথ্য, মতামত ও ব্যাখ্যা সামনে আসছে। তাই গবেষণাধর্মী বইয়ের গুরুত্ব বেড়েছে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, প্রামাণ্য ইতিহাস ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয় উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল লেখকের কাজ। একই সঙ্গে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল ও মতের বৈচিত্র্যের মধ্যেও বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অভিন্ন পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক ও পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। জাতীয়তাবাদ ধারণ করতে হলে মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আলোচনায় অংশ নেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও কবি আবদুল হাই শিকদার, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহমিনা আখতার, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আবদুল লতিফ মাসুম এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মোহনা টিভির নির্বাহী পরিচালক এম এ মালেক।

আবদুল হাই শিকদার বলেন, বই একটি জাতির চিন্তা ও চেতনার দীর্ঘস্থায়ী দলিল। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে ইতিহাস, রাজনীতি ও দর্শনের আলোকে আরও ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন।

অধ্যাপক তাহমিনা আখতার বলেন, জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যুক্তিনির্ভর ও গবেষণামূলক আলোচনা বাড়ানো জরুরি।

ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তা প্রয়োজন।

এম এ মালেক বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় বইটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সিবিএসের সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল হক নানু। তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে সুস্থ, যুক্তিনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক আলোচনা সময়ের দাবি। সিবিএস ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা অব্যাহত রাখবে।

স্বাগত বক্তব্য দেন সিবিএসের সহসভাপতি ও শামসুন্নাহার হল ছাত্রদল সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহীন আক্তার শিমুল। বই নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করেন লেখক রুহুল আমিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিবিএসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম মেঘ।

আখিনুর জ্যোতির সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র পরিষদের সভাপতি ও চলচ্চিত্র পরিচালক বদিউল আলম খোকন, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ড. মোস্তফা মজিদ, ইউএনওপিএসের সাবেক কান্ট্রি ম্যানেজার এরশাদ করিম, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের মহাসচিব রফিকুল ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র পরিষদের মহাসচিব এবিএম সোহেল রশিদ।

লেখক রুহুল আমিন বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে শুধু কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং দেশের ইতিহাস, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, জনগোষ্ঠী, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রচিন্তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে। বইটির উদ্দেশ্য কোনো বিতর্ক থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং এ বিষয়ে আরও গবেষণা, পাঠ ও মুক্তবুদ্ধির আলোচনা সৃষ্টি করা।

‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ : তারেক রহমান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ বইটি প্রকাশ করেছে দুর্বার পাবলিকেশন্স। ১৪৪ পৃষ্ঠার বইটিতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক ভিত্তি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা এবং তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হয়েছে।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, জাতীয় পরিচয়, রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে এ ধরনের গবেষণাধর্মী প্রকাশনা জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।