ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বগুড়া-৬ আসনে উপ-নির্বাচন ও শেরপুর-৩ আসনের সাধারণ নির্বাচন আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে। এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোট চলবে বিরতিহীন।
গতকাল বুধবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পরিস্থিতি সন্তোষজনক।
বগুড়া-৬
এই আসনে নির্বাচনের প্রার্থীরা হলেন- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মো. রেজাউল করিম বাদশা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. আবিদুর রহমান ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) মো. আল-আমিন তালুকদার।
১৫০টি ভোটকেন্দ্র ও ৮৩৫টি ভোটকক্ষে মোট ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩০৯ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। নির্বাচনে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ২৫০ জন, বিজিবি ৮ প্লাটুন (১৮৯ জন), র্যাব ১০টিম (৭০ জন), পুলিশ ১৩২৭ জন ও আনসার ভিডিপি ১৯৯০ জন সদস্য নিয়োজিত করা হয়েছে।
শেরপুর-৩
এই নির্বাচনে বিএনপির মো. মাহমুদুল হক রুবেল, জামায়াতে ইসলামীর মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ এবং বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান প্রতিদ্বদ্বিতা করছেন।
১২৮ টি ভোটকেন্দ্রের ৭৫১টি ভোটকক্ষে ৪ লাখ ৯ হাজার ৮০৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
ভোটের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ১৪০ জন সদস্য, বিজিবি ১৬ প্লাটুন (৩২৮ জন), রবের ১৪টিম (১৩৫ জন), পুলিশ ১১৫৫ জন ও আনসার ভিডিপি ১৭০৪ জন সদস্য নিয়োজিত রয়েছে।
এদিকে ভোটকেন্দ্রে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বিভিন্ন বাহিনীর ১৮ থেকে ২০ জন নিরাপত্তা সদস্য থাকছে। নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম নিয়োজিত রয়েছে ৩৬ জন। ইসির নিজস্ব পযবেক্ষক মোতায়েন থাকছে ১৮ জন করে। এছাড়া স্থানীয় সংস্থার পযবেক্ষক আছে চার শতাধিক।
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনের ভোট হয়। এসময় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দু’টি আসনে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে বগুড়া-৬ আসন তিনি ছেড়ে দেওয়ায় এখন উপ-নির্বাচন করতে হচ্ছে ইসিকে।
আর তফসিল ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় তখন শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত হয়। বৃহস্পতিবার সেখানে সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ আগেই জয়যুক্ত হওয়ায় এখন আসন দুটিতে আর গণভোট হবে না।
রিটার্নিং অফিসারের নিরপেক্ষতা নিয়ে জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগ
মোস্তফা মোঘল, বগুড়া অফিস
আজ বৃহস্পতিবার বগুড়া-৬ সদর আসনের উপনির্বাচন। উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা (ধানের শীষ), জামায়াতের কেন্দ্রিয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বগুড়া শহর আমির আবিদুর রহমান সোহেল (দাঁড়িপাল্লা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন মোঃ আল-আমিন (ফুলকপি)। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী তারেক রহমান ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আবিদুর রহমান সোহেল ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট পেয়েছিলেন। বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের ফলে উপনির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বীতা হতে পারে এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ মুহূর্তে দুই মূলপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন গতকাল বুধবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল। তিনি অভিযোগ করেছেন, “রিটার্নিং অফিসার নিরপেক্ষ ভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। লিখিতভাবে একাধিকবার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলেও তিনি তা আমলে নেননি। তিনি একটি দলের পক্ষে কাজ করছেন। বার বার নিরপেক্ষ লোকদের প্রিজাইডিং অফিসার সহ নির্বাচনের সকল কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানানো স্বত্ত্বেও তিনি সরকারি দলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রিজাইডিং অফিসার সহ সকল নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ দান করেছেন।” তিনি অভিযোগ করেন, “১৫০ টি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারের তালিকা প্রদানের দাবি প্রায় ১০ দিন আগে করা হলেও রিটার্নিং অফিসার তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আমরা বিভিন্নভাবে প্রিজাইডিং অফিসারদের তথ্য পেয়ে এর মধ্যে ১৬ জনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে প্রমাণকসহ রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দাখিল করেছি। রিটার্নিং অফিসারের এহেন অস্বচ্ছ এবং দলীয় পদধারী লোকদের নির্বাচনে নিয়োগদানের জন্য তীব্র নিন্দা এবং সকল প্রিজাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত এমন দলীয় লোকদেরকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার দাবি জানাচ্ছি।” সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে ধানের শীষের পক্ষে মিছিল করার প্রতিবাদ জানিয়ে আবিদুর রহমান বলেন, “মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের সরকারি চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে মিছিলে অংশ নিচ্ছেন। সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়েও তারা যেভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় লিপ্ত হচ্ছেন, তা সরকারি চাকরি-শৃংখলা ও আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন। এছাড়াও আমরা জানতে পেরেছি যে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামতে বাধ্য করা হয়েছে। এছাড়া গ্রামে গ্রামে আমাদের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ হুমকিসহ নানা ভাবে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘিœত করার চেষ্টা চলছে।” অপরদিকে, বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসময় তিনি বলেন, “যারা নেকাব পরে ভোট কেন্দ্রে যাবেন তাদের নেকাব খুলে তারপর ভোট দিতে পারবেন।” বিএনপি প্রার্থীর এই বক্তব্য প্রচারের সাথে সাথে শহরের নেকাবধারী নারীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নেকাব পরা নারী জেলা নির্বাচন অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন। এসময় তারা জেলা নির্বাচন অফিসার ও উপনির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের সাথে সাক্ষাত করে তাদের ক্ষোভের কথা জানান এবং ভোট কেন্দ্রে নেকাবধারী ও হিজাবধারী নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী জানান। রিটার্নিং অফিসার নারীদের কথা শুনে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য নারী ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। নারী ভোটারদের নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিয়ে নির্বিঘেœ বাসায় ফেরার ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন করবে বলেও তিনি আশ^স্ত করেন। বিক্ষুব্ধ নারী বিএনপি প্রার্থীর বক্তব্য প্রত্যাহার এবং তার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিচার দাবী করলে রিটার্নিং অফিসার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। বিক্ষুব্ধ নারীরা এরপর বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এবং বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা কর্তৃক নেকাব বিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট অভিযোগ দেন। এদিকে, জামায়াত প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন অফিসার ফজলুল করিম সরকারি বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পত্র পাঠিয়েছেন।
উল্লেখ্য, বগুড়া-৬ সদর আসনের মোট ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩০৯ জন। পুরুষ ২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, নারী ২ লাখ ৩০ হাজার ৩৭৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ১০ জন। পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনের কেন্দ্র ১৫০টি, মোট বুথের সংখ্যা ৮৩৫টি। এর মধ্যে স্থায়ী ৭৮৭টি এবং অস্থায়ী ৪৮টি। ১৫০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫৩টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। এর মধ্যে ৫টি কেন্দ্রকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামানো হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) সূত্রে জানা গেছে, মোট কেন্দ্রের মধ্যে ৫টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৯৭টি সাধারণ কেন্দ্র রয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো হলো- বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের পুরাতন (উচ্চ মাধ্যমিক) ভবনের পুরুষ ও মহিলা কেন্দ্র, ভান্ডারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং বগুড়া করোনেশন ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পুরুষ ও মহিলা কেন্দ্র। এসব অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে প্রতি কেন্দ্রে ৬ জন করে পুলিশ সদস্য এবং ১৫ থেকে ১৬ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ৫ জন করে পুলিশ এবং ১২ থেকে ১৫ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে থাকবেন। দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা। এদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আট প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল থেকে তারা দায়িত্ব পালন শুরু করেছে এবং আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করবে। বগুড়া সদর উপজেলার তিনটি বেইজ ক্যাম্পে অবস্থান নিয়ে বিজিবি সদস্যরা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। শুক্রবার থেকে তারা সক্রিয়ভাবে টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু করেছেন। এছাড়াও ৮ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টা থেকে ৯ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত ট্রাক, মাইক্রো, ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর পাশাপাশি ৭ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে ১০ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ফজলুল করিম বলেন, নির্বাচনকালীন সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তারা ২ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবেন। তিনি আরও বলেন, ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন এবং পরবর্তী সময় এই তিন পর্যায়েই বিজিবি সদস্যরা টহলসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।