বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই ভোটের ফল মেনে সরকার গঠন করা হলেও গণভোটের রায় মানতে আপত্তি করছে সরকার।

আজ বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত শিক্ষা শিবিরে প্রধান অতিথি হিসেবে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যার রেকর্ড বিভিন্ন গণমাধ্যমে রয়েছে। ‘মানুষের সঙ্গে কী রকম দ্বিচারিতা হলে একই বিষয়ে একেক রকম অবস্থান নেওয়া সম্ভব?’

তিনি আরও বলেন, বলা হচ্ছে, এই গণভোট বৈধ নয়, সংবিধানে এর অস্তিত্ব নেই। তাহলে আপনি যে এমপি হলেন, মন্ত্রী হলেন—এটা কোন সংবিধানে আছে? পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো গণভোটের রায় বাতিল হয়নি। গণভোটের ফলাফল অস্বীকার করা হলে জনগণের মতামত ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।

গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের হক মেরে খাওয়ার জন্যই বিরোধী দলকে উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সরকারের দৃষ্টিতে যেন জামায়াতকে ভোট দেওয়া লোকজন এ দেশের নাগরিক নন। তাই তাদের কোনো অধিকার নাই। শুধু বিএনপির ভোটাররাই সরকারের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। সে কারণে বিএনপির এমপিদের এলাকায় একের পর এক বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হলেও জামায়াতসহ ১১ দলের এমপিদের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য করছে সরকার। তাদের প্রাপ্য সাধারণ বরাদ্দও কাটছাট করে তা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছে তারা। আর বিশেষ বরাদ্দের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে লুটেপুটে খাওয়ার নেশায় মেতে উঠেছে।

সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, অনিয়মতান্ত্রিক কাজে ব্যাপক প্রতিযোগিতা চলছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে। সে কারণে ব্যাপক অন্তঃকোন্দল দেখা দিয়েছে সরকারি দলে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনায়। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। কার্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করাসহ অর্থ গ্রহণ, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির নগ্ন নোংরামিও দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সর্বস্তরে দলীয়করণ দেশের জন্য মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করেছে বর্তমান সরকার। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অন্তত ১১টি পদে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি সরকার চরম অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে। এভাবে সারা দেশে জেলা পরিষদ, সিটি ও পৌরসভার মেয়র পদে দলীয় নেতাদের বসিয়েছে। আবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছি নির্বাচন কমিশনে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে নিয়োগকৃত সরকারদলীয় লোকদেরও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার দাবি করেছি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিষয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, এমপিদের যদি স্বাধীনভাবে ও গোপনে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ১১ দল মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। কিন্তু ৭০ অনুচ্ছেদ তাদের দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য বাধ্য করে রেখেছে। এ ধরনের নিয়ম পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এজন্যই সংবিধান সংস্কার করা দরকার। আমরা দাবিও জানিয়েছি। কিন্তু সরকার তা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করবে না। কারণ নিজেদের ভোট দেওয়া গণভোটই তারা মানছেন না।

তিনি আরও বলেন, সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ঐকমত্য কমিশনে সম্মত হয়েও তারা সংস্কার কমিশনই অস্বীকার করছে। অথচ একই অধ্যাদেশে নির্বাচন করে সরকার গঠন করেছেন। অর্থাৎ যেটাতে তাদের সুবিধা হবে, সেটা মানবেন আর যেটা করলে দেশ ও জনগণের জন্য ভালো হবে, তা করবেন না। এমন দ্বিচারিতার কারণেই আগামীতে ভরাডুবি হবে। স্থানীয় নির্বাচনেই এর প্রতিফলন ঘটবে। তবে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও অঞ্চলের সহকারী পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর অঞ্চলের টিম সদস্য মাওলানা আব্দুল হাকিম, নীলফামারী-১ আসনের এমপি ও নীলফামারী জেলা আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আনতাজুল ইসলাম, নীলফামারী-৪ আসনের এমপি মাওলানা আব্দুল মুত্তাকিমসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।