নবম পে-স্কেলের আদলে দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ ১০ দফা দাবি জানিয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ। সংগঠনটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় নিয়ে বৈষম্যহীনভাবে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ১০ দফা দাবিতে আয়োজিত সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক মর্যাদাকে বিবেচনায় নিয়ে যেভাবে নবম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে, একই মাপকাঠিতে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক বা ‘ম্যানেজ’ করা মজুরি শ্রমিকরা মেনে নেবেন না।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ নারী-পুরুষ শ্রমিক পোশাকশিল্পে কর্মরত। তাঁরা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখলেও তাঁদেরই মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের কথা। আগামী ডিসেম্বরের আগেই মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও এখনো মজুরি বোর্ডের বৈঠক হয়নি। ফলে দ্রুত বোর্ড গঠন না করলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, “অনতিবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করুন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে, পোশাকশ্রমিকদের ক্ষেত্রেও জীবনযাত্রার মান, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।”
আগের মতো গড়পড়তা বা কোনো পক্ষকে খুশি করতে ‘ম্যানেজ’ করা মজুরি নির্ধারণ করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শ্রমিকদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো গোষ্ঠী বা পক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে মজুরি নির্ধারণের চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দেন তিনি।
২০২৩ সালের শ্রমিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে আতিকুর রহমান বলেন, ওই সময় ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রতিবাদে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। গাজীপুরে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে এক শ্রমিক নিহত হলেও এখনো ওই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে বিভিন্ন কারখানা থেকে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। অবিলম্বে ছাঁটাই বন্ধ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কল-কারখানা চালুর দাবি জানান তিনি।
মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করার অভিযোগ তুলে আতিকুর রহমান বলেন, এর মাধ্যমে শ্রমিকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অবিলম্বে এ ধরনের কালো তালিকাকরণ বন্ধ না হলে বিজিএমইএ ভবন অভিমুখে কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
শ্রম আদালতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে একজন শ্রমিক তাঁর ন্যায্য পাওনা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। শ্রম আদালতের মামলা সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গার্মেন্টস খাতে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার দাবি জানিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলেও পোশাকশ্রমিকরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই গার্মেন্টস খাতেও মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার দাবি জানান তিনি।
একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন করতে গিয়ে শ্রমিকদের ছাঁটাই ও হয়রানি বন্ধেরও দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে উন্নয়ন মঞ্চের সদস্য সোহেল রানা মিঠুর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম, গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্রের সভাপতি সাহিদা সরকার, জাতীয় গার্মেন্টস-সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. রফিক, সবুজ বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন ঠান্ডু, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি রুজিনা আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাছিরসহ শ্রমিক নেতারা।
সমাবেশ শেষে শ্রমিকদের ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি পালন করা হয়।
সবশেষে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা না হলে শ্রমিকদের নিয়ে বৃহৎ পরিসরে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।