সরকারের প্রতি জামায়াতের আট দফা আহ্বান
বিএনপি সরকার প্রথম ছয় মাসে ফ্যাসিস্টের দেখানো পথেই হাঁটছে এবং মোটা দাগে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন নিয়ে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ছয় মাসে কয়েকটি মৌলিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অনীহা, ভয়াবহ গ্যাস-জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনার অভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের চাপ, শিক্ষকদেরকে কৌশলে রাজনীতি থেকে বিরত রাখার চক্রান্ত, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের অভিযোগ, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ বন্ধকরণ, গুম প্রতিরোধ আইনে উদ্বেগজনক ফাঁক এবং পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত দুর্বলতা এই বিষয়গুলোকে মোটেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো সরকারের প্রথম ছয় মাসের রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা, অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন আমরা এসব ব্যর্থতা তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরছি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের নেতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ সুস্পষ্ট রায় দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০ এবং ‘না’ ভোট ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ব্যবধান আড়াই কোটিরও বেশি ভোট। এটি শুধু সংস্কারের পক্ষে সাধারণ মতামত ছিল না। এর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামোও যুক্ত ছিল। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছিল, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে এবং পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর হয়নি। সরকার পরবর্তীতে সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিকল্প পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। এছাড়া জুলাই সনদের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিষয় রয়েছে। যার একটিরও বাস্তবায়ন দেখা যায়নি গত ছয় মাসে।
গ্যাস ও জ্বালানি সংকট সমাধানে কোনো সাময়িক ব্যবস্থাপনা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২,৭০০ থেকে ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং অন্যান্য গ্রাহকের ওপর। দেশীয় ২০টি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্র থেকে জুলাইয়ে দৈনিক প্রায় ১,৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংকটের তুলনায় দেশীয় উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর ফল এখনও দৃশ্যমান নয়। এই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে ৪০ শতাংশ কম উৎপাদন চলছে শিল্পকারখানায়। প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত বাংলাদেশের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। কাতারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর মার্চে বাংলাদেশকে দুটি স্পট এলএনজি কার্গো কিনতে হয় প্রতি গগইঃঁ ২৮.২৮ ডলার ও ২৩.০৮ ডলারে। পরবর্তীতে কাতারএনার্জি বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ২০২৬ সালের এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেয়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৭ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির মধ্যে প্রায় ৪.১৫ মিলিয়ন টন কাতার থেকে এসেছিল। আমাদের প্রশ্ন, এত বড় আমদানি নির্ভরতার পরও বিকল্প এলএনজি উৎস, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত ফুয়েল রিজার্ভ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে শিল্প ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অগ্রাধিকার নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা কোথায়?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ প্রসঙ্গে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, সরকার মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রথম ছয় মাসেই প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হয়েছে। আমাদের খাতভিত্তিক পর্যালোচনাতেও পদোন্নতি, পদায়ন, ওএসডি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে দলঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। আমরা লক্ষ্য করেছি, সরকার একসঙ্গে ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতা-কর্মীদের নিয়োগের তথ্যও উঠে এসেছে। প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন সংস্কার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব নিয়োগে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মার্চে সাতটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ইউজিসি চেয়ারম্যান হিসেবে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাঁদের সবারই বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন বা দলীয় কাঠামোর সঙ্গে অতীত বা বর্তমান সংশ্লিষ্টতা ছিল।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে এবং বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু সরকারি ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তথ্য উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ তৈরি করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে দেশজুড়ে ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হওয়ার তথ্যও টিআইবি তুলে ধরেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক গবেষণায় মার্চ-মে, এই তিন মাসেই ৯১৫টি হত্যা মামলা, ৪৬১টি ডাকাতি, ২৮৬টি অপহরণ, ৩ হাজার ২৭৭টি চুরি এবং ৫ হাজার ৪৪৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য পাওয়া যায়। একই পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুধু মার্চ-মে ২০২৬-এ ৯১৫টি হত্যা মামলা নিবন্ধিত হয়েছে। যেখানে পুরো ২০২৫ সালে এর সংখ্যা ছিল ৭৬৭ এবং ২০২৪ সালে এর সংখ্যা ছিল ৭৯৪। একই সঙ্গে মব ও রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী-শিশু নির্যাতন এবং সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ উচ্চ পর্যায়ে থাকার কথা উঠে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘর্ষ, দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও অঙ্গসংগঠনের নামও অভিযোগ হিসেবে এসেছে। আমরা কাউকে অভিযোগের ভিত্তিতেই অপরাধী ঘোষণা করছি না। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় যেন কোনো ব্যক্তিকে আইনি বা প্রশাসনিক সুবিধা না দেয়। অপরাধীর পরিচয় রাজনৈতিক নয়। আইনের চোখে সে কেবল অপরাধের অভিযুক্ত।
পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর Bangladesh First -কে পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ছয় মাসের অভিজ্ঞতায় আমরা মনে করি, এই ঘোষণাকে এখনও একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত Operational foreign-policy framework- রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি এবং ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেই বলতে হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য আরও Conducive Environment প্রয়োজন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকটেও প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি নেই। মিয়ানমারের প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অজুহাতে প্রত্যাবাসন এখনও শুরু হয়নি। একই সময়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ঘাটতিও বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। সেই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা স্পষ্ট বোঝা গেছে।
দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, জুন ২০২৬-এ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৬১ শতাংশ। অথচ জুন ২০২৫-এ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমলেও সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনও উচ্চ এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাজারের চাপ অব্যাহত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ থেকে ৯.১৬ শতাংশে নামা মানে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। বরং দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমা। বাস্তবে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের ওপর ক্রমেই চাপ ফেলছে। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে, কিন্তু বাজারে সেই অনুপাতে স্বস্তি ফিরছে না।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের ঘোষণা আছে, কিন্তু আস্থা ও শৃঙ্খলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের, এটি আমরা স্বীকার করি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। কিন্তু সরকারের প্রথম ছয় মাসেও খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং উচ্চ সুদের চাপ থেকে বের হওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা আগের বছরের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকে সরকারদলীয় হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ইসলামী ব্যাংক ডাকাতির বড় ডাকাতকে মামলা থেকে বাঁচানোর ষড়যন্ত্র হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জোর করে নির্দেশ দিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নিয়োগকৃত আইনজীবী পরিবর্তনে বাধ্য করেছেন।
গুম প্রতিরোধ আইনের ফাঁক দৃশ্যমান হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, গুমের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো না ঘটে, এটি জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম মৌলিক প্রত্যাশা। সরকার নতুন Prevention and Remedy of Enforced Disappearance Act , ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ১৭ জুন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইএউ ৩/২০২৬ যোগাযোগের মাধ্যমে খসড়াটির কয়েকটি বিধান নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানান। টিআইবিও মাত্র এক দিনের সময় দিয়ে অংশীজনের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সমালোচনা করেছে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার, গুম প্রতিরোধের নামে এমন কোনো আইন হতে পারে না, যেখানে গোপন আটক বা অস্বীকৃত হেফাজতের সামান্য সুযোগও থেকে যায়। চূড়ান্ত বিলের আগে সংশোধিত খসড়া প্রকাশ, স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা এবং ভুক্তভোগীদের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা স্বীকার করি, আমাদের দেশে অনেক সমস্যা রয়েছে। জনগণ সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নয়, সমাধান দেওয়ার জন্য। কিন্তু বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সময়ক্ষেপণ, নীতিগত দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং বাস্তব ফলাফলের ঘাটতি সরকারের ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করেছে। তাই, আমরা মনে করি প্রথম ছয় মাসে সরকার সামগ্রিকভাবে জনগণের সামনে এমন কোনো শক্তিশালী অর্জন উপস্থাপন করতে পারেনি, যাতে সরকারের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতি আস্থা বাড়ায়। আমরা চাই সরকার এই বাস্তবতা স্বীকার করুক। কারণ জনগণের আস্থা শুধু বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি বা পরিকল্পনায় তৈরি হয় না। দৃশ্যমান ফলাফলে তৈরি হয়। আগামী সময়ে সরকার যদি প্রথম ছয় মাসের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখাতে না পারে, তাহলে জনগণের হতাশা ও আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। আমাদের প্রত্যাশা একটাই, সরকার এখন ব্যাখ্যা নয়, ফলাফল দেখাবে। প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন দেখাবে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা নয়, তার প্রমাণ দেবে।
সরকারের প্রতি জামায়াতের আট দফা আহ্বান
জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকারের প্রতি জামায়াতের আট দফা আহ্বান জানানো হয়েছে। তন্মধ্যে- ১. গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ, ১৮০ কার্যদিবসের বাস্তবায়ন কাঠামো এবং গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারগুলো কোন প্রক্রিয়ায় ও কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে, তা জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে। ২. গ্যাস ও জ্বালানি সংকটকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত Energy Security Strategy প্রণয়ন করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত জ্বালানি মজুত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে শিল্প ও বিদ্যুৎখাতের সরবরাহ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিতে হবে। ৩. প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা, পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড করতে হবে এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক নিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। ৪. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। হত্যা, মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, দখল, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় যেন কোনো অভিযুক্তকে প্রশাসনিক বা আইনি সুবিধা না দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মধ্যপ্রাচ্য, জ্বালানি কূটনীতি, শ্রমবাজার ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, কৌশল ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলসহ একটি পূর্ণাঙ্গ Foreign Policy Framework প্রকাশ করতে হবে। ৬. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী, অস্বাভাবিক মুনাফা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে হবে। ৭. ব্যাংকিং খাতে আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। ইচ্ছাকৃত ও প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা, দুর্বল ব্যাংকের স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদনশীল খাতে স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে যেকোনো দলীয় বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ৮. গুম প্রতিরোধ আইনে গোপন আটক বা অস্বীকৃত হেফাজতের সব ধরনের আইনি সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। চূড়ান্ত আইন প্রণয়নের আগে সংশোধিত খসড়া প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং গুমের শিকার পরিবার, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম ও প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকারসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।