বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকের ঘামেই অর্থনীতি সচল অথচ বাজেটে নেই তার প্রতিফলন।
গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় গার্মেন্টস সেক্টর প্রতিনিধি সভা ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় অফিস হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাতের প্রধান চালিকাশক্তি শ্রমিক শ্রেণী হলেও জাতীয় বাজেটে তাদের ন্যায্য মূল্যায়ন প্রতিফলিত হয়নি। আজ আমরা শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলছি। বাংলাদেশের যে খাতের শ্রমিকদের অবদানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, সেই শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৪৯ জন শ্রমিক শহীদ হয়েছেন, যার মধ্যে দুইজন নারী শ্রমিকও ছিলেন। শুধু জুলাই আন্দোলন নয়, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” স্লোগান বুকে-পিঠে লিখে আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা নূর হোসেনও ছিলেন একজন শ্রমজীবী ভ্যানচালক।
আতিকুর রহমান বলেন, গত চার দশকে দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং উন্নয়নযাত্রায় শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-দেশ এগিয়েছে, শিল্প-কারখানা বেড়েছে, অর্থনীতি বড় হয়েছে; শ্রমিকদের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে?
তিনি জানান, ১০ বছর আগে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট ছিল ২৬৩ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ০.০০৬ শতাংশ। এবারের বাজেটে বরাদ্দ বেড়ে ৪৬৭ কোটি টাকা হলেও তা মোট বাজেটের মাত্র ০.০০৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ে দেশের শ্রমশক্তিতে প্রায় দুই কোটি নতুন শ্রমিক যুক্ত হয়েছে। ফলে প্রকৃত অর্থে শ্রমখাতের বরাদ্দ কমেছে বলেই মনে হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে পাঁচ সদস্যের একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক ব্যয় ছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা, অথচ ন্যূনতম মজুরি ছিল মাত্র ৫ হাজার টাকা। বর্তমানে একই পরিবারের মাসিক ব্যয় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু ২০২৩ সালে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করলে শ্রমিকরা তাদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অর্ধেকও উপার্জন করতে পারছেন না।
বাজেট প্রণেতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা বাজেট প্রণয়ন করেন, তাদের মধ্যে শ্রমিকবান্ধব মানসিকতার অভাব রয়েছে। যারা শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাদের মূল্যায়ন বাজেটে প্রতিফলিত হয় না।
তিনি জানান, বাজেট ঘোষণার আগেই শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর সংস্কার, শ্রমিক সুরক্ষা তহবিল গঠন এবং মজুরি সুরক্ষা প্রকল্প চালুর প্রস্তাব দিয়েছিল। কারণ বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই, লে-অফ, বকেয়া মজুরি এবং শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্টভুক্ত করার ঘটনা ঘটছে। অনেক শ্রমিক বছরের পর বছর মামলা চালিয়েও ন্যায্য পাওনা আদায় করতে পারছেন না। কিন্তু এসব বিষয়ে বাজেটে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে নারী শ্রমিকদের জন্য পরিবহন সুবিধা, ডে-কেয়ার সেন্টার এবং ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থানকে তিনি স্বাগত জানান। পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও আরও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান।
তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ শ্রমিক অপুষ্টিতে ভুগছেন। শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক হাসপাতাল এবং সহজ চিকিৎসা সুবিধার দাবি দীর্ঘদিনের। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শ্রমিক হাসপাতালে বেড পান না; বারান্দায় বা বাইরে থেকে বিছানা কিনে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ দাবি এবারের বাজেটে উপেক্ষিত হয়েছে।
শ্রমিকদের আবাসন সংকটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান মজুরিতে একটি পরিবারকে এক কক্ষের বাসায় গাদাগাদি করে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের নিয়েও একই কক্ষে বসবাস করতে হয়, যা অমানবিক। একটি ছোট কক্ষের ভাড়াই এখন ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বারবার বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি সেই হারে বাড়েনি।
আতিকুর রহমান বলেন, আমরা দৃশ্যমানভাবে বুঝতে পারছি, দেশের শ্রমিকদের সঙ্গে রাষ্ট্র অমানবিক আচরণ করছে। বাসাভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, অথচ শ্রমিকদের আয় বাড়ছে না। ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকাও অনেক শ্রমিকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, টিসিবির পণ্য কিংবা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাও অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে পৌঁছায় না। ফলে বৈষম্য দূর হওয়ার পরিবর্তে তা আরও প্রকট হচ্ছে। আমরা যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, সেই বৈষম্য এখনও বহাল রয়েছে। এবারের বাজেট শ্রমিকদের সেই বৈষম্য দূর করতে পারেনি।
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, দেশে প্রায় ৪২টি শ্রমিক ফেডারেশন রয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সমস্যার কথা বলাই যথেষ্ট নয়, সমাধানের পথও দেখাতে হবে। কেউ কাজ না করলেও আমরা যারা শ্রমিকদের বাস্তবতা বুঝি, তাদের দায়িত্ব হলো শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া। নিয়মতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে শ্রমিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন যুগ্মসাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা মিঠুর সঞ্চালনায় আরো উপস্থিত ছিলেন গাজিপুর মহানগরীর গার্মেন্টস সেক্টরের সভাপতি ফারদিন হাসান হাসিব, বিজিএমই সদস্য আরিফুল হক, গার্মেন্টস সেক্টর সহ-সম্পাদক খোরশেদ আলমসহ প্রগতিশীল গার্মেন্টস সেক্টরের নেতৃবৃন্দ।