বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসে দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না’ (সিপিসি)-এর ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘পূর্বের জোয়ার, চীন ও বাংলাদেশ একসাথে চলে’ শীর্ষক এই সেমিনারে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জাবিহুল্লাহ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) এমপি। এছাড়া সেমিনারে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী এমপি, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি, বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাংক ও শিক্ষাবিদগণ অংশ নেন।

পারস্পরিক শ্রদ্ধা সার্বভৌমত্বের নীতিতে সম্পর্ক জোরদার: রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সিপিসির দীর্ঘ গৌরবময় পথচলার ইতিহাস এবং চীনের আধুনিকায়নে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সিপিসি বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সম্প্রতি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং দলগত পর্যায়ে সিপিসি ও বিএনপির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চীন সবসময় বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন জানায় এবং যেকোনো ধরনের বাহ্যিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের প্রভাব খাটানোর জোরালো দাবি: জামায়াতে ইসলামী

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি সিপিসির ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চীনকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি চীনের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের প্রশংসা করেন।

আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ (চট্টগ্রাম বন্দর) অর্থনৈতিক করিডোরের গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হবে। তবে এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি মানবিক সংকটে চীনের ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, "বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহন করছে। আমরা আশা করি, চীন তার বিপুল আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে, যাতে তারা অবিলম্বে তাদের নিজ মাতৃভূমি রাখাইনে ফিরে যেতে পারে।"

অংশীদারিত্ব হতে হবে সমতার ভিত্তিতে: ব্যারিস্টার মীর আহমদ (আরমান) এমপি

বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) এমপি চীনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ একটি জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করেছে এবং তারা নিজস্ব সার্বভৌমত্ব নিয়ে সচেতন।

মিয়ানমার সংকটে চীনের কার্যকর মধ্যস্থতার দাবি জানিয়ে তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, "বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ কেবল মিয়ানমারের জান্তা সরকারের হাতে নেই, সেখানে আরাকান আর্মিসহ অন্যান্য সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বাস্তব প্রভাব রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করতে চীনকে তার অনন্য অবস্থান ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে কেবল জান্তা সরকারের সাথে নয়, বরং আরাকান আর্মিসহ রাখাইনের সব অংশীজনের সাথে সমন্বিতভাবে আলোচনা করতে হবে।"

তিনি আরও সতর্ক করেন যে, যেকোনো চুক্তি বা করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চুক্তিগুলো অবশ্যই সমতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হতে হবে, কোনো ধরনের নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে নয়।

অভিন্ন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা

সেমিনারে আগত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সুধীজন চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই নতুন ধারাকে স্বাগত জানান এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণে এই বন্ধুত্ব সামনের দিনগুলোতে আরও সুসংহত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।