সচিব কমিটির বৈঠকে ৫ সিদ্ধান্ত
১ জুলাই থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে
সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র
(Decision Area)
সচিব কমিটির মূল সিদ্ধান্ত ও রূপরেখা
(Key Decisions & Roadmap)
প্রত্যাশিত প্রভাব
(Expected Impact)
দুই ধাপে বাস্তবায়ন
(Two-Step Implementation)
পূর্বের ৩টি ধাপের পরিবর্তে কর্মচারীদের দ্রুত আর্থিক সুবিধা দিতে মাত্র ২টি পৃথক ধাপে পুরো নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি কার্যকর করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
দ্রুত বর্ধিত বেতন প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ
নিম্ন গ্রেডে বেশি সুবিধা
(Lower Grade Benefits)
১ম-৯ম গ্রেডে প্রথম ধাপে ৪০% বৃদ্ধি হলেও, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ১০ম-২০তম গ্রেডের সাধারণ কর্মচারীদের প্রথম ধাপেই ৬০% বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নিম্ন আয়ের বৈষম্য ও অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস
বেতন বৈষম্য দূরীকরণ
(Disparity Reduction)
বিশেষ করে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘ বছর ধরে চলে আসা গ্রেডভিত্তিক বেতন বৈষম্য নিরসনে বিশেষ রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।
প্রচলিত গ্রেড বৈষম্যের স্থায়ী অবসান
ভাতা ও সুবিধা বৃদ্ধি
(Allowance Increase)
মূল বেতনের পাশাপাশি বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য বিধান
কারিগরি ও আইনি প্রস্তুতি
(Technical & Legal Steps)
আইনি ভেটিং ও বিধিমালা দ্রুত সংশোধন করার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দ্রুত বেতন নির্ধারণ বা ফিক্সেশনের ব্যবস্থা করা হবে।
১ জুলাই থেকে কার্যকরের পথ সুগম
একনজরে নতুন পে-স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির ৫টি প্রধান সিদ্ধান্ত
কামাল উদ্দিন সুমন : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন এই পে-স্কেল কার্যকর করার চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে সরকারের পুনর্গঠিত সচিব কমিটি একটি নীতি নির্ধারণী বৈঠক সম্পন্ন করেছে। এই বৈঠকে আর্থিক, কারিগরি ও আইনি বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।
গতকাল বুধবার পে স্কেল বাস্তবায়নের রূপরেখা ও বাস্তবায়নে সচিব কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে নি¤œ আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং প্রচলিত বেতন বৈষম্য দূরীকরণ (Salary disparity reduction)-এর বিষয়গুলোকেই এই সভার মূল এজেন্ডা করা হয়েছে।
সভায় পে কমিশনের জনপ্রশাসন সংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত হলেও বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর সুপারিশ নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা যায়নি। এই দুই সংস্থার ব্যাপারে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।
তবে কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাবে, কয় ধাপে বাড়বে এ বিষয়গুলো গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি সভায় উপস্থিত কোনো সদস্য। এদিকে এলপিআর ভোগরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নবম পে স্কেলের আওতায় আসবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।
জানা গেছে, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করা হবে। জুলাই থেকে ধাপে ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়ন হবে। তবে বর্ধিত বেতনের অর্থ হাতে পেতে অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির ডাকা গুরুত্বপূর্ণ সভা শেষ হয়েছে। সভায় বেসিকের কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছেÑসেটি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
জানা গেছে, নবম জাতীয় পে স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেসিকের কত শতাংশ আগামী অর্থবছর থেকে বৃদ্ধি পাবে, সেটি জানা না গেলেও তিনটি বিকল্প ধরে কাজ করছে সরকার। সচিব কমিটির প্রথম প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা রয়েছে। বিকল্প হিসেবে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ এবং ১০ম-২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হতে পারে। আরেকটি বিকল্প হিসেবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেসিক শতভাগ বৃদ্ধির চিন্তাভাবনাও রয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে বহুল আলোচিত এই নতুন পে-স্কেল আপডেট ২০২৬ (New pay scale update 2026)-এর বৈঠকের ৫টি প্রধান দিক নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. তিন ধাপের বদলে দুই ধাপে কার্যকরের রূপরেখা (Two-step implementation process)
পূর্বে নতুন বেতন কাঠামো তিন বছরের তিনটি পৃথক ধাপে বাস্তবায়নের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হলেও, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির মুখে সরকার সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। কর্মচারীদের দ্রুত আর্থিক সুবিধা দিতে তিন ধাপের জটিল প্রক্রিয়া পরিহার করে মাত্র দুই ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব পাশ করা হয়েছে।
২. নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রথম কিস্তিতেই বড় সুবিধা (Extra benefits for lower grade employees) : অর্থনৈতিক মন্দা ও দ্রব্যমূল্যের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ কর্মচারীদের ওপর। তাই ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য প্রস্তাবিত বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন বৃদ্ধি (10th to 20th grade salary increase)-র ক্ষেত্রে প্রথম ধাপেই ৬০ শতাংশ দেওয়ার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৩. গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য নিরসনে বিশেষ জোর (Focus on eliminating wage discrimination)
১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মাঝে দীর্ঘ বছর ধরে যে গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য চলে আসছিল, তা দূর করতে বিশেষ রোডম্যাপ তৈরি করছে সচিব কমিটি। নতুন বেতন স্কেলে নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে থাকা কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
৪. মূল বেতনের পাশাপাশি ভাতা বাড়ানোর তাগিদ (Increase in house rent and allowances)
বৈঠকে কেবল মূল বেতন বাড়ানোর মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল না। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে সংগতি রেখে সরকারি কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা (House rent and medical allowance) সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বিষয়ে পে-কমিশনের সুপারিশ (Pay commission recommendations) দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাস্তবায়ন করা হবে।
৫. ডিজিটাল রূপান্তর ও আইনি জটিলতা নিরসন (Legal and technical preparation updates)
পে-স্কেল ঘোষণার পর যেন কোনো আইনি বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা না দেয়, সেজন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আইনি ভেটিং ও বিধিমালা দ্রুত সংশোধন করার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দ্রুত নতুন বেতন নির্ধারণ বা ফিক্সেশনের কারিগরি রূপরেখা বৈঠকে জমা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানান, অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং সরকার ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। তবে প্রশাসনিক, আইনি এবং ডাটাবেজ আপগ্রেডের কাজ শেষ করে কর্মচারীদের হাতে বর্ধিত বেতনের টাকা পৌঁছাতে আরও ২ থেকে ৩ মাস সময় লেগে যেতে পারে। অবশ্য আইনগতভাবে ১ জুলাই থেকেই নতুন স্কেল কার্যকর ধরা হবে বিধায় কর্মচারীরা পরবর্তী সময়ে বকেয়া বা অ্যারিয়ার্স হিসেবে এই টাকা এককালীন পেয়ে যাবেন। এই সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের লাখো সরকারি চাকরিজীবীর মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।