খুলনা প্রেসক্লাবে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের মহড়া এবং কর্তব্যরত সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত রোববার বিকেলের এ ঘটনায় রাতেই খুলনা সদর থানায় ৪ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। পুলিশ সিসি টিভি ফুটেজ যাচাই করে কয়েকজনকে চিহ্নিত করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ৩০ এপ্রিল খুলনা প্রেসক্লাবের বার্ষিক নির্বাচনকে বানচাল করতে একটি মহলের ইন্ধনে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ সাংবাদিক নেতাদের।
ঘটনার প্রতিবাদে রোববার রাতে প্রেসক্লাবের সামনের সড়ক অবরোধ করে এবং সোমবার দুপুরে একই স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে খুলনা প্রেসক্লাব। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী বলে ফুটেজে দেখা গেছে। খুলনা বিএনপির শীর্ষ নেতারা জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণের আশ^াস দিয়েছেন।
জানা গেছে, রোববার বিকেল ৬টার দিকে ২০/২৫ জন খুলনা প্রেসক্লাব চত্বরে প্রবেশ করে খুলনা সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি ও দৈনিক প্রবর্তন সম্পাদক মোস্তফা সরোয়ারকে খুঁজতে থাকে। তারা মোস্তফার নাম ধরে গালিগালাজ করে। মোস্তফা সেখানে না থাকলেও অবস্থানরত সাংবাদিকরা তাদের উশৃঙ্খল ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের প্রতিবাদ করলে বহিরাগতরা বাকবিকন্ডায় লিপ্ত হয়। তারা দৈনিক সময়ের খবরের সম্পাদক তরিকুল ইসলামকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে উদ্যত হয়। এ সময় সেখানে অবস্থানরত সাংবাদিক ও বহিরাগতদের মধ্যে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে তারা প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে স্যার ইকবাল রোড হয়ে বড় বাজারের দিকে চলে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
রাতে খুলনা সদর থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারে বাদী প্রেসক্লাবের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার দত্ত উল্লেখ করেন, সন্ধ্যা ৬টা ৫মিনিটের দিকে কয়েকজন সন্ত্রাসী বেআইনিভাবে দেশি অস্ত্রসহ খুলনা প্রেসক্লাবে অনাধিকার প্রবেশ করে। এ সময় তারা কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয় এবং তাদের মারপিট করে। মামলার এজাহার নামীয় আসামীরা হলেন রিপন আকন, গাউস, হালিম ও মিজান। এছাড়া আরও ২০/২৫ জন অজ্ঞাত আসামী রয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার এস আই বিশ্বজিৎ বসু জানান, মধ্যরাতে মামলাটি রুজু হয়। পরে আমাকে তদন্তভার দেওয়া হয়। রাতভর বিভিন্নস্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু আসামীদের কাউকে এ পর্যন্ত আমরা গ্রেফতার করতে পারিনি।
থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আমরা সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। তা দেখে তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা করেছি।
সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি : ঘটনার নিন্দা জানিয়ে রাতেই প্রেসক্লাবের সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন সাংবাদিকরা। এ সময় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ নির্বাচনকে বানচাল করতে প্রথমে আদালতে একটি মামলা করিয়েছে। কিন্ত তাতেও নিশ্চিত হতে না পেরে বহিরাগত সন্ত্রাসীদেরকে ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবে নাশকতা করিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সিসি টিভি ফুটেজে দেখা গেছে হামলাকারীরা শ্রমিক দলের মহানগর শাখা ও ২১ নং ওয়ার্ড শাখার বিভিন্ন পদের নেতা।
বিএফইউজে ও এমইউজে খুলনার নিন্দা ও প্রতিবাদ : খুলনা প্রেসক্লাবে ঢুকে সাংবাদিকদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে ও মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (এমইউজে) খুলনার নেতৃবৃন্দ। সংগঠন দু’টির নেতারা অবিলম্বে এ হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান। বিবৃতিদাতারা হলেন-বিএফইউজের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ও সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, এমইউজে খুলনার সভাপতি মো. রাশিদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মো. নূরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রানা, সহ-সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম নূর, কোষাধ্যক্ষ মো. রকিবুল ইসলাম মতি, নির্বাহী সদস্য মো. এরশাদ আলী ও কে এম জিয়াউস সাদাত। অনুরূপ বিবৃতি দিয়েছেন বিএফইউজের, সাবেক সহ-সভাপতি ড. মো. জাকির হোসেন, সাবেক নির্বাহী সদস্য শেখ দিদারুল আলম ও এইচ এম আলাউদ্দিন।
খুলনা অঞ্চল জামায়াতের নিন্দা ও প্রতিবাদ : খুলনা প্রেসক্লাবে ঢুকে সাংবাদিকদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খুলনা অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৬ এপ্রিল রোববার বিকেলে খুলনা প্রেসক্লাবে যে ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে তা মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাংবাদিকদের সেকেন্ড হোম খ্যাত প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢুকে এমন জঘন্য ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমরা সকলকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, সাংবাদিকতা হলো জনগণের স্বার্থে সত্য তথ্য প্রকাশ করার পেশা এবং তা কোনোভাবেই নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করা যায় না। সরকারের নিকট সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিধানের জোর দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি সাংবাদিকদের উপর হামলাকারীদেরকে সিসি টিভি ফুটেজ যাচাই করে যাদেরকে শনাক্ত করেছে তাদেরকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
বিবৃতিদাতারা হলেন-বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ এমপি, সহকারী পরিচালক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি, টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান খান এমপি, মাস্টার শফিকুল আলম ও হাফেজ রবিউল বাশার এমপি, খুলনা মহানগরী আমীর অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান ও সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন এমপি, খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন ও সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সাতক্ষীরা জেলা আমীর উপাধ্যক্ষ শহীদুল ইসলাম মুকুল ও সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান, বাগেরহাট জেলা আমীর মাওলানা রেজাউল করিম ও সেক্রেটারি শেখ মো. ইউনুস।