বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, শ্রম ও শ্রমিক-এই দুয়ের ওপরেই গড়ে উঠেছে আজকের আধুনিক সভ্যতা।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি আজ (শুক্রবার) এ কথা বলেন।

বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, সভ্যতার বিকাশে শ্রমিকের অবদান সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তারাই শ্রমের মর্যাদা পায় না। অবহেলায় কাটে তাদের দিন। আর শ্রমজীবী মানুষ হিসেবে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ মিডিয়া তাদের সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেয় না। অথচ ওয়েজবোর্ডে বেতন দেবেন এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন দেন। এসব ঠকবাজ মালিকদের বিরুদ্ধে ইউনিয়নকে সক্রিয় হতে হবে।

বিএফইউজের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম। অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, একেএম মহসিন, খায়রুল বাশার, এরফানুল হক নাহিদ, আবু বকর, বাবুল তালুকদার, শাহজান সাজু, রফিক মুহাম্মদ, মোদাব্বের হোসেন, দিদারুল আলম দিদার, শাহনাজ পলি, খন্দকার আলমগীর, এম মোশাররফ হোসেন, তালুকদার রুমি, আবদুল্লাহ মজুমদার, নিজাম উদ্দিন দরবেশ, রাজু আহমেদ প্রমুখ।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, শ্রম ও শ্রমিক-এই দুয়ের ওপরেই আজকের আধুনিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের সুউচ্চ অট্টালিকা শ্রমিকদের ঘামের উপরেই গড়ে উঠেছে। যে তাজমহলকে নিয়ে আজ বিশ্বে এত মাতামাতি সেই স্থাপনাতেও লেগে আছে শ্রমিকের ঘাম। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ভবন দুবাইয়ের মিউজিয়াম অফ দ্য ফিউচার-এর পেছনেও রয়েছে শ্রমিকের ত্যাগের ইতিহাস। বিশ্বের সবচেয়ে দামি গাড়ি রোলস-রয়েস লা রোজ নোয়ার ড্রপটেইল; নতুন একটি গাড়ির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৬০ কোটি টাকারও বেশি। অথচ বিলাসবহুল এই যান তৈরির মূল কারিগরও শ্রমিকরা। জুতা থেকে শুরু করে সবধরনের পোশাক; টুথপেস্ট, ব্রাশ ও সাবান থেকে সব প্রসাধনী তৈরিতেই শ্রমিকের অবদান রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আজকের সমাজ যেন কুলি-মজুর আর সাহেব এই দুই শ্রেণিতে ভাগ হয়ে গেছে। সভ্যতা যতই এগিয়ে যাচ্ছে সেই বিভাজন ততই বাড়ছে। এই পার্থক্য গড়ে তুলেছে অর্থ। যার অর্থ আছে সে মালিক, যার নেই সেই শ্রমিক! অথচ সমাজে সবাই কাজ করে, সবাই শ্রম দেয়। মালিকের ভূমিকায় যারা আছেন তারা এই সহজ সত্য উপলব্ধি করতে পারে না আর পারলেও তা স্বীকার করতে চান না।

এই সাংবাদিক নেতা জানান, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। অথচ কোন প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। অনিরাপদ কর্ম পরিবেশের কারণে ২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মোট ১১৯০ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২২২ জন। ২০২৪ সালে মোট ৮২০ জন শ্রমিক নিহত এবং আহত হয়েছেন ২৯২ জন। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৭০৭ জন। আর কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন ১১৩ জন। ২০২৩ সালে কর্মক্ষেত্রে ১৪৩২ জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। আহত হন ৫০২ জন।

তিনি বলেন, যেকোনো শ্রমিক বা কর্মজীবীর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা হচ্ছে। কর্মজীবী, বিশেষ করে শ্রমিকের নিরাপত্তাহানিজনিত মর্মস্পর্শী অনেক ঘটনার নজির আমাদের সামনে রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলো বরাবর একই অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। আর তা হল-কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু তার প্রতিফলন যথাযথভাবে ঘটেনি।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, তৈরি পোশাক খাতে ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতের অধিকাংশ শ্রমিক এখনও সুরক্ষার বাইরে। কার্যকর সুরক্ষা কমিটির অভাব, সীমিত পরিদর্শন ব্যবস্থা, নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তাঘাটতি এবং সামাজিক ঝুঁকি এসব এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

তিনি জানান, সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় সড়কে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। শুধু নিয়ম মানার ওপর নির্ভর না করে নিরাপত্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হবে। কার্যকর শ্রম আইন প্রয়োগ, পরিদর্শন জোরদার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবধর্মী উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। এ জন্য প্রমাণভিত্তিক গবেষণা ও অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

আবদুল হাই শিকদার বলেন, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বিচিত্রা, আনন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য শেখ হাসিনা সরকার যেমন দায়ী, তেমনি আমাদের সাংবাদিক নেতারাও কম দায়ী নন। এই পত্রিকাগুলো পুনরায় চালু করতে হবে। এতে অন্তত দেড় হাজার সাংবাদিক চাকরির সুযোগ পাবেন।

তিনি আরও বলেন, ওই পত্রিকাগুলোতে ভিন্নমতের (বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী) সাংবাদিকদের প্রাধান্য ছিল বলেই পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এতে শত শত সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েন।

শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী সাংবাদিকদের বেতন দেয় না।