সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানবপাচারের অভিযোগে এক মামলায় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড পাঠিয়েছে আদালত। ২০০৭-০৮ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির এমডি। ওই কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগেই গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় এ মামলা দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান। সোমবার গভীর রাতে বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এক-এগারোর পটপরিবর্তনে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। তখন তিনি গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হন। পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। এই কমিটির অধীনেই তখন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়।

২০০৮ সালে মাসুদ উদ্দিন অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার তিন দফায় তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে। অবসরগ্রহণের পর তিনি ঢাকায় রেস্তোরাঁসহ একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়নে দুই দফায় (২০১৮ ও ২০২৪) ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। পরে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিম-লীর সদস্যপদ পান এবং জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করেন।

গতকাল মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করে ওই মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ডিবি পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের এসআই রায়হানুর রহমান। আবেদনে বলা হয়, এ মামলার ১০১ আসামির মধ্যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম রয়েছে ৩ নম্বরে। গ্রেপ্তারের পর মামলার ঘটনার বিষয়ে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সুচতুর চালাক প্রকৃতির লোক হওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদে নিজেকে আড়াল করে মামলার বিষয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। এমতাবস্থায় মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, পলাতক আসামি গ্রেফতার, আত্মসাৎ করা ও চাঁদার টাকা উদ্ধার, মূল অপরাধী চক্র সনাক্তসহ অন্যান্য আসামি গ্রেফতার করার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। এজন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান জানান, রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। অন্যদিকে মাসুদ উদ্দিনের পক্ষে তার আইনজীবীরা রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ জামিন নাকচ করে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ৫ দিন রিমান্ডে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

পুলিশের হিসেবে, তাঁর বিরুদ্ধে ফেনী জেলায় ৬টি মামলা আছে। আর ঢাকা মহানগর এলাকায় মামলা আছে ৫টি। মোট মামলা ১১টি। তাঁকে পল্টন থানার মানব পাচারের অভিযোগের একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

আওয়ামী লীগ আমলের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর ও সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জন এ মামলার আসামি।

মামলার এজাহারে বাদী আলতাব খান অভিযোগ করেছেন, জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও মামলার আসামিরা সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করেছেন। মামলার আসামি সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তার ছেলেকে সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবর্হিভূতভাবে প্রবাসী নামে একটি অ্যাপ চালু করার অনুমোদন দিয়ে ওই চক্রকে সহযোগিতা করেছেন।

বাদীর অভিযোগ, মামলার আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে তার সরলতার সুযোগ নিয়ে ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগ করে মানবপাচারের উদ্দেশ্যে তার কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত চাঁদা হিসেবে মাথাপিছু দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের কাছ থেকে ১২ কোটি ৫৬ লাখ এক হাজার টাকা আদায় করেছে। ওই চক্র অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে আত্মসাৎ করেছে।

রাজনীতিকদের নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্তে পেলে ব্যবস্থা: পুলিশ

সাবেক সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শীর্ষ রাজনীতিকদের নির্যাতনের সঙ্গে তখনকার সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে পুলিশ। তাকে গ্রেফতারের বিষয়ে জানাতে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান, ডিআইজি শফিকুল ইসলাম এ কথা বলেন।

এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর জরুরি অবস্থার মধ্যে জেনারেল মাসুদই রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতনের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন বলে যে ধারণা চালু আছে, সে বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করবে কি-না, তা জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকরা। জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা যদি এটা পাই তদন্তে, আমরা তো অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেব। অন্যায়কারী যেই হোক, পার পাবে না বলে হুঁশিয়ার করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এরকম যদি কোনো বিষয় আসে, বা এরকম যদি কেউ থাকে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত যে কারো অধিকার আছে আইনের আশ্রয় নেওয়ার। এখনো যদি নেয়, আমরা তাকে ওয়েলকাম জানাব।

ঢাকার ডিবি প্রধান বলেন, যে মামলার তদন্তভার তাদের হাতে থাকে, সে মামলার বিষয়ই তারা বিবেচনায় নিয়ে থাকেন। তবে একইসঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যত রাখতে এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে সকল অন্যায় ও অবিচারের বিচার নিশ্চিতের চেষ্টা তারা করেন।

২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ সে সময় আলোচিত গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় যে সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন, তখন ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত। সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত। বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পরে চার তারকা জেনারেল হন) মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কার্যত সেই প্রভাবশালী কমিটি (গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি) পরিচালনা করতেন, যাদের নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও সে সময় আটক করা হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেফতার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০০৮ সালের জুনে লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠানো হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে সেই দায়িত্বে রাখে। অবসরের সময় হয়ে গেলে তার চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পাশাপাশি শুরু করেন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা। ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির এমডি তিনি। ২০১৮ সালে তিনি এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে ডিআইজি শফিকুল ইসলাম বলেন, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদের বিরুদ্ধে ফেনী ও ঢাকায় ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার পল্টন থানার একটি মানবপাচারের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।