মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে পাসপোর্ট জটিলতা, শ্রমিক নিয়োগ, অবৈধ অভিবাসন এবং দক্ষ জনশক্তির চাহিদা নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। হাইকমিশনে পৌঁছালে কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) ও হেড অব চ্যান্সারি প্রণব কুমার ভট্টাচার্যসহ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানান।
আলোচনায় অধ্যাপক মুজিবুর রহমান প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে হাইকমিশনের কার্যক্রম, প্রবাসীদের সেবা প্রদান এবং এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান।
এ সময় হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অভিবাসীদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে আনুমানিক ৮ থেকে ১৫ লাখ অভিবাসী রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাইকমিশনার জানান, মালয়েশিয়ায় মোট ৩৭টি কারাগার রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের আটক ব্যক্তিদের রাখা হয়। এ ছাড়া অবৈধ অভিবাসীদের জন্য দেশটিতে ১৭টি ডিটেনশন ক্যাম্প রয়েছে। এসব কারাগার ও আটককেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৯০০ বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন বলে জানানো হয়। তাঁদের প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে হাইকমিশনার জানান, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়েও হাইকমিশন কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য (ফ্রি ট্রেড) নিয়েও আলোচনা হয়। হাইকমিশনারের উদ্যোগে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তি বা সমঝোতা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এ উদ্যোগকে বর্তমান সরকারের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনায় হাইকমিশনার বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টি সরাসরি আলোচনায় না এসে অনেক সময় রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, যা দুঃখজনক। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে এবং বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে সুযোগ রয়েছে। দেশটিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি রয়েছে বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও তাঁদের আত্মমর্যাদার বিষয়েও অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জানতে চান। জবাবে হাইকমিশনার জানান, বর্তমানে নারীদের জন্য দক্ষ ও অদক্ষ—উভয় ধরনের কর্মসংস্থানের ভিসার সুযোগ সীমিত বা কার্যত অনুপস্থিত রয়েছে।
বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে, যার বর্তমান মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলে বৈঠকে জানানো হয়। ভবিষ্যতে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাই সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তাঁদের রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য তিনি পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
তিনি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য বাংলাদেশ সরকার ও বিরোধী দলের কাছে তুলে ধরার জন্য হাইকমিশনের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দালালদের দৌরাত্ম্য কমানো, অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও হয়রানি বন্ধ করা এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে হাইকমিশনকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচনায় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ, শ্রমবাজার এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী, ডেপুটি হাইকমিশনার মোসাম্মাদ শাহানারা মনিকা এবং প্রধান চ্যান্সারি প্রণব কুমার ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মালয়েশিয়া শাখার সেক্রেটারি জেনারেল ড. খাইরুল ইসলাম, ড. ইউসুফ আলী এবং সাইফুদ্দিন ইয়াহহিয়া উপস্থিত ছিলেন।