ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান

স্বাধীনতার শব্দগত অর্থের দিকে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই? পাই বাধাহীনতা, স্বচ্ছন্দ্যতা, নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিজের বশে আছে এমন অবস্থা। অন্যদিকে পরাধীনতা বলতে আমরা কি বুঝি? অন্যের অধীন, পরবশ, অন্যের অধীনতায় বসবাস বা জীবনযাপন করা।

মানুষ জন্মগত ভাবে একটি স্বাধীন ও বাক সর্বস্ব প্রাণী। পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণী একই সঙ্গে স্বাধীন ও বাকসর্বস্ব নয়। তাই একমাত্র মানুষের জন্যে স্বাধীনতা একান্ত ভাবে আবশ্যক। নইলে মানুষের জীবন অচল ও স্থবির হতে বাধ্য। সুতরাং মানুষ নামের স্বাধীন ব্যক্তি মানুষ অথবা সমষ্টিগত মানুষের জন্য স্বাধীনতা অত্যাবশ্যক বলে প্রমাণিত এবং সার্বজনীনভাবে গৃহীত। আমরা বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের গর্বিত নাগরিক। আমরা আমাদের দেশের জনগণ বেশ কয়েকবারই পরাধীনতার স্বাদ ও কাঠিন্যতা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। আমরা আমাদের জীবনের চরম পরম যে আশা-আকাঙ্ক্ষা সেসব পূরণে ব্যস্ত হয়েছি বারবার। কারণ যারা আমাদেরকে কয়েকবার শাসন করেছে তারা আমাদের জীবনের চরম পরম আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে বার বার বাধা দিয়েছে। আমরা আমাদের মঞ্জিলে মাকসুদে পড়তে পারিনি।

আমাদের জীবনের চরম পরম আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো কি কি? যেগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত- আমাদের জীবনের আদর্শ ও জীবন বিধান - সে আদর্শ ও বিধানের অধীনে আমরা আমাদের জীবন ও জীবিকা চালাতে সক্ষম হয়নি। আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ও প্রচার ব্যতীত কিছুই অর্জিত হয়নি আমাদের জীবনে সমাজে। যারা আমাদেরকে শাসন করেছে তারা তাদের আদর্শ নীতি-নিয়ম দ্বারা শুধু শাসনই করেনি শোষণ ত্রাশ প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আমরা লুণ্ঠিত হয়েছি, আমরা ব্যর্থ হয়েছি। পদে পদে নিগৃহীত হয়েছি, শোষিত বঞ্চিত হয়েছি, আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর পরে আমাদের দেশ নতুন এক যাত্রা পথে আগুয়ান। আমরা প্রত্যাশা করছি আমরা আমাদের জীবনের আদর্শ ও বিধি-বিধান দ্বারা আমাদের জাতীয় জীবনকে ঢেলে সাজাতে সচেষ্ট হব সক্ষম হব।

যে দেশের জনগণ যে আদর্শের, যে বিধি-বিধানের ধারক-বাহক, সে আদর্শ বিধি বিধানের ভিত্তিতে তাদের দেশ ও সমাজ চলে না- সে সময় আজও সে দেশ কি তাদের জীবনকে সুখী ও শান্তিময় করতে পারে? পারে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনগণ যে আদর্শ নিয়ম নীতি গ্রহণ করেছে সে আদর্শের দ্বারা তাদের দেশ ও সমাজ পরিচালিত করছে আমরা কেন পারব না?

আমরা তবে কি ধরনের স্বাধীন দেশের মানুষ হলাম? আমরা তাহলে কি ধরনের সার্বভৌম দেশের জনগণ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছি? এটা এক ধরনের বিশাল বৈপরীত্য, বিরাট অবিমৃষ্যকারিতা; একদম নিষ্ঠুর নির্মম হঠকারিতা ছাড়া আর কি। দীর্ঘকালের এই ধরনের অবিমৃষ্যকারিতার কারণে আমরা আজও দুঃখ দারিদ্রর করাল গ্রাস এবং অনুন্নত সমাজ সংশয় হতে মুক্ত হতে সক্ষম হইনি। আমরা যে তিমিরে ছিলাম দীর্ঘ পথযাত্রায় কয়েকবারের স্বাধীনতার পরেও সে তিমিরেই আটকে গেছি ফাটা বাঁশের চিপায় পড়ে। এর থেকে উদ্ধারের একমাত্র পথ হল- আমরা স্বাধীন দেশের জনগণের জাতীয় আদর্শের ভিত্তিতে দেশকে গড়ে তুলতে পারলেই সকল তিমির দূরীভূত হবে ইনশাআল্লাহ ।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক